মানুষের জীবনের ৪০ বছর পূর্ণ হওয়ার পর শরীরে স্বাভাবিকভাবেই নানা ধরনের শারীরিক ও হরমোনজনিত পরিবর্তন শুরু হয়। এই বয়সে শরীরের বিপাকক্রিয়া (মেটাবলিজম) ধীরে ধীরে কমে যায়, ফলে বিভিন্ন অঙ্গের কার্যক্ষমতাও আগের মতো থাকে না। এরই মধ্যে শরীর কিছু গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ দেখাতে শুরু করে, যা সময়মতো চিনে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
অনেকেই এসব প্রাথমিক সমস্যা বয়সের স্বাভাবিক প্রভাব ভেবে গুরুত্ব দেন না। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, এই ছোট ছোট লক্ষণ ভবিষ্যতে ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ, থাইরয়েডের সমস্যা, অস্টিওপোরোসিস কিংবা শরীরে গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিনের ঘাটতির মতো গুরুতর রোগের ইঙ্গিত হতে পারে। তাই ৪০ বছরের পর নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১. পর্যাপ্ত বিশ্রামের পরও সারাক্ষণ ক্লান্তি ও দুর্বলতা
প্রতিদিন ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুমানোর পরও যদি সারাদিন শরীরে ক্লান্তি, অবসাদ বা শক্তির অভাব অনুভব করেন, তবে তা অবহেলা করবেন না। এটি শরীরে আয়রন, ভিটামিন বি১২ অথবা ভিটামিন ডি-এর ঘাটতির লক্ষণ হতে পারে। এছাড়াও থাইরয়েডের সমস্যা বা রক্তাল্পতার প্রাথমিক ইঙ্গিতও হতে পারে। দুর্বলতার সঙ্গে মাথা ঘোরা বা শ্বাসকষ্ট হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
২. কোনো কারণ ছাড়াই হঠাৎ ওজন বেড়ে যাওয়া বা কমে যাওয়া
খাদ্যাভ্যাস বা ব্যায়ামে কোনো পরিবর্তন না থাকা সত্ত্বেও যদি ওজন দ্রুত বেড়ে যায় বা কমে যায়, তবে তা হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, লিভার বা কিডনির সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। ৪০ বছরের পর ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে, তাই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা জরুরি।
৩. হাড়, জয়েন্ট ও পেশিতে দীর্ঘদিন ধরে ব্যথা
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাড়ের ঘনত্ব কমতে থাকে। যদি হাঁটু, কোমর, কাঁধ বা ঘাড়ে দীর্ঘদিন ধরে ব্যথা থাকে, তবে তা ক্যালসিয়ামের ঘাটতি, অস্টিওআর্থ্রাইটিস বা অস্টিওপোরোসিসের প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে। নিজে থেকে ব্যথার ওষুধ না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত প্রোটিন ও ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার রাখুন।
৪. উচ্চ কোলেস্টেরল ও উচ্চ রক্তচাপ
৪০ বছরের পর উচ্চ রক্তচাপ এবং রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। এই দুটি সমস্যাকে অনেক সময় "নীরব ঘাতক" বলা হয়, কারণ শুরুতে তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। দীর্ঘদিন অবহেলা করলে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। তাই খাবারে অতিরিক্ত লবণ ও তেল কমিয়ে দিন এবং নিয়মিত রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল পরীক্ষা করুন।
৫. অতিরিক্ত তৃষ্ণা ও বারবার প্রস্রাব হওয়া
যদি হঠাৎ করে খুব বেশি জল পিপাসা পায়, রাতে বারবার প্রস্রাব করতে হয় অথবা চোখে ঝাপসা দেখতে শুরু করেন, তবে এটি টাইপ-২ ডায়াবেটিসের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হতে পারে। যাদের পরিবারে ডায়াবেটিসের ইতিহাস রয়েছে, তাদের ৪০ বছরের পর অন্তত প্রতি ৬ মাস অন্তর রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করা উচিত।
৪০ বছরের পর সুস্থ থাকার কিছু গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাস
• বছরে অন্তত একবার সম্পূর্ণ স্বাস্থ্য পরীক্ষা (ফুল বডি চেকআপ) করান।
• প্রতিদিন অন্তত ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট দ্রুত হাঁটুন বা নিয়মিত হালকা ব্যায়াম করুন।
• খাদ্যতালিকায় আঁশযুক্ত খাবার, সবুজ শাকসবজি, ফল এবং অঙ্কুরিত শস্য রাখুন। চিনি, ময়দা ও অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলুন।
• মানসিক চাপ কমাতে নিয়মিত যোগব্যায়াম ও ধ্যান করুন। ধূমপান ও মদ্যপান থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকুন।
মনে রাখবেন: ৪০ বছর মানেই বার্ধক্য নয়। বরং এই সময় থেকেই নিজের শরীরের প্রতি আরও যত্নবান হওয়ার প্রয়োজন। শরীরের ছোট ছোট পরিবর্তনকে অবহেলা না করে সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে অনেক বড় রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।

No comments:
Post a Comment