মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান তাঁর বিরুদ্ধে হত্যার হুমকি দিয়েছে। এর জবাবে তিনি বলেছেন, যদি তাঁর ওপর কোনো হামলা হয় বা তাঁকে হত্যা করা হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র এমন কঠোর পাল্টা জবাব দেবে যা আগে কখনও দেখা যায়নি।
ট্রাম্পের এই বক্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের দাবি ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই বলছেন, ট্রাম্প নাকি আগে থেকেই এমন একটি গোপন নির্দেশ দিয়ে রেখেছেন, যাতে তাঁর মৃত্যু ঘটলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইরানের বিরুদ্ধে ব্যাপক সামরিক হামলা শুরু হয়ে যাবে। তবে বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও সামরিক কাঠামো এতটা সরল নয়।
যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নিহত হলে কী হয়?
মার্কিন সংবিধানের ২৫তম সংশোধনী (25th Amendment) এবং Presidential Succession Act of 1947 অনুযায়ী, দায়িত্ব পালনরত প্রেসিডেন্ট মারা গেলে বা দায়িত্ব পালনে অক্ষম হলে ভাইস প্রেসিডেন্ট অবিলম্বে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
অর্থাৎ, যদি কোনো কারণে ডোনাল্ড ট্রাম্প নিহত হন, তাহলে ভাইস প্রেসিডেন্ট জে.ডি. ভ্যান্স যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রেসিডেন্ট এবং সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক (Commander-in-Chief) হিসেবে দায়িত্ব নেবেন। এরপর দেশের নিরাপত্তা, সামরিক পদক্ষেপ কিংবা প্রতিশোধমূলক কোনো অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাংবিধানিক ক্ষমতা তাঁর হাতেই থাকবে।
'ডেড ম্যানস সুইচ' কি সত্যিই আছে?
অনলাইনে প্রচারিত একটি বড় দাবি হলো, প্রেসিডেন্ট নিহত হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে দেওয়ার মতো একটি 'ডেড ম্যানস সুইচ' যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে।
এ ধরনের দাবির পক্ষে কোনো সরকারি বা নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যবস্থায় প্রেসিডেন্টের মৃত্যুর পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুদ্ধ বা পারমাণবিক হামলা শুরু হয়ে যাবে—এমন কোনো পরিচিত ব্যবস্থা নেই।
বরং বাস্তবে প্রেসিডেন্টের মৃত্যুর পর নতুন প্রেসিডেন্ট, প্রতিরক্ষা দপ্তর, জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ, জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ (NSC) এবং সংশ্লিষ্ট সামরিক কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করেন।
ট্রাম্প কি আগে থেকেই সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিতে পারেন?
একজন প্রেসিডেন্ট সামরিক বাহিনীকে সম্ভাব্য হুমকির জন্য প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিতে পারেন। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে হবে, সে সম্পর্কেও পরিকল্পনা অনুমোদন করতে পারেন।
তবে সেই নির্দেশ ভবিষ্যতের প্রেসিডেন্টকে আইনগতভাবে বাধ্য করে না। নতুন প্রেসিডেন্ট চাইলে আগের নির্দেশ বহাল রাখতে পারেন, আবার প্রয়োজন মনে করলে তা পরিবর্তন বা বাতিলও করতে পারেন।
অর্থাৎ, যদি জে.ডি. ভ্যান্স প্রেসিডেন্ট হন, তাহলে ট্রাম্পের আগের নির্দেশ অনুসরণ করবেন কি না, সেটি তাঁর নিজস্ব সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের জরুরি সামরিক পরিকল্পনা
যুক্তরাষ্ট্র বহু দশক ধরে সম্ভাব্য পারমাণবিক যুদ্ধ, বড় সন্ত্রাসী হামলা কিংবা রাষ্ট্রপ্রধান নিহত হওয়ার মতো পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য বিস্তৃত Continuity of Government (COG) পরিকল্পনা তৈরি করে রেখেছে।
এই পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য হলো—
সরকারের কার্যক্রম সচল রাখা,
সামরিক কমান্ড অক্ষুণ্ন রাখা,
সাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর নিশ্চিত করা,
জাতীয় নিরাপত্তা বজায় রাখা।
তবে এসব পরিকল্পনায় প্রেসিডেন্ট নিহত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বয়ংক্রিয় প্রতিশোধমূলক হামলার কোনো বিধান প্রকাশ্যে জানা যায় না।
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য
শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান তাঁর বিরুদ্ধে হত্যার হুমকি দিয়েছে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সম্ভাব্য যেকোনো হামলার জবাব দিতে প্রস্তুত রয়েছে এবং প্রয়োজনে অত্যন্ত কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তাঁর বক্তব্যে আরও ইঙ্গিত দেওয়া হয় যে, ইরান যদি হামলা চালায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত ও শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া জানাবে। তবে এসব মন্তব্য মূলত রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের প্রেক্ষাপট
গত কয়েক সপ্তাহে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালী ঘিরে নিরাপত্তা সংকট, ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, ড্রোন অভিযান এবং একে অপরের সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
এই সংঘাতের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে এবং বিশ্ববাজারেও এর প্রভাব পড়ছে, বিশেষ করে জ্বালানি তেলের দামে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর হুঁশিয়ারি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিলেও, প্রেসিডেন্ট নিহত হলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রতিক্রিয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে শুরু হবে—এমন দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী প্রথমে ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং এরপর তিনিই দেশের নিরাপত্তা ও সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা পান।

No comments:
Post a Comment