কলকাতার মেট্রোপলিটন এলাকার একটি দলীয় কার্যালয়কে কেন্দ্র করে তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ বিরোধ নতুন মাত্রা পেল। দলীয় কার্যালয়ে তালা ঝোলানো এবং দখলের চেষ্টার অভিযোগ তুলে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, ফিরহাদ হাকিম, অরূপ রায়, সন্দীপন সাহা, প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় ও বিপ্লব রায়ের বিরুদ্ধে প্রগতি ময়দান থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছে কালীঘাটপন্থী তৃণমূল নেতৃত্ব। শুক্রবার রাতে কুণাল ঘোষ, মদন মিত্র-সহ একাধিক নেতা থানায় গিয়ে অভিযোগ জমা দেন। অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, দলীয় কার্যালয়ে বেআইনিভাবে তালা লাগিয়ে সেটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, যা দলীয় শৃঙ্খলা এবং সংগঠনের স্বাভাবিক কার্যক্রমের পরিপন্থী।
থানা থেকে বেরিয়ে কুণাল ঘোষ সাংবাদিকদের বলেন, যাঁরা তৃণমূল ভবনে তালা দিতে গিয়েছিলেন, তাঁরা প্রকৃতপক্ষে সরকারের সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করছেন। তাঁর অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবে দলের মধ্যে বিভ্রান্তি ও অস্থিরতা সৃষ্টি করে সাংগঠনিক কাঠামো দুর্বল করার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, এই ঘটনার মাধ্যমে সাধারণ কর্মীদের মধ্যে ভুল বার্তা পৌঁছে দেওয়ারও চেষ্টা করা হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত শুক্রবার দুপুরে। আচমকাই ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে একদল তৃণমূল বিধায়ক মেট্রোপলিটনের ওই দলীয় কার্যালয়ে পৌঁছান। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন ফিরহাদ হাকিম, সন্দীপন সাহা, জাভেদ খান, আখরুজ্জামান-সহ আরও কয়েকজন বিধায়ক। সেখানে বৈঠক শেষে তাঁরা কার্যালয়ের মূল ফটকে তালা লাগিয়ে এলাকা ত্যাগ করেন। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসতেই রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক চর্চা শুরু হয়।
ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠদের দাবি, তৃণমূল কংগ্রেসের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস, সংগঠনের বিকাশ এবং বহু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের সঙ্গে এই কার্যালয়ের আবেগঘন সম্পর্ক রয়েছে। তাঁদের বক্তব্য, কার্যালয়ের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও সাংগঠনিক ব্যবহারের স্বার্থেই সেটির দায়িত্ব নিজেদের হাতে নেওয়া হয়েছে। তাঁদের দাবি, এই পদক্ষেপ সম্পূর্ণ সংগঠনের স্বার্থে নেওয়া হয়েছে এবং এর পেছনে অন্য কোনও উদ্দেশ্য নেই।
অন্যদিকে, খবর ছড়িয়ে পড়তেই ঘটনাস্থলে পৌঁছে যান স্থানীয় বিধায়ক এবং কালীঘাটপন্থী শিবিরের অন্যতম মুখ কুণাল ঘোষ। তিনি কর্মীদের শান্ত থাকার আহ্বান জানান এবং কোনওরকম উত্তেজনায় না জড়ানোর অনুরোধ করেন। পরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি ঋতব্রত শিবিরের পদক্ষেপকে দায়িত্বজ্ঞানহীন ও অগণতান্ত্রিক বলে আখ্যা দেন।
কুণাল ঘোষ আরও অভিযোগ করেন, যাঁদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে জলাভূমি ভরাট, জমি দখল এবং জমি সংক্রান্ত বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে স্থানীয় মানুষের ক্ষোভ রয়েছে, তাঁরাই এখন দলীয় কার্যালয়ের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করছেন। তাঁর মতে, নির্বাচনে দলের হতাশাজনক ফলাফলের পর যখন সাধারণ কর্মীরা নেতৃত্বের কাছ থেকে ঐক্যবদ্ধ ভূমিকার প্রত্যাশা করেছিলেন, তখন কিছু নেতা উল্টে দলের ভেতরেই নতুন করে সংঘাত তৈরি করছেন।
তিনি আরও বলেন, তাঁরা একদিকে থানা, আদালত এবং এলাকায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সংগঠনকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করছেন, অন্যদিকে কিছু নেতা বিরোধী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে বৈঠক করে দলের অন্দরে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন। সাধারণ মানুষ এই সমস্ত ঘটনাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
ঘটনার পর থেকেই দলীয় কার্যালয় ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে পুলিশ। এখনও পর্যন্ত অভিযুক্ত নেতাদের পক্ষ থেকে থানায় দায়ের হওয়া অভিযোগ নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, দলীয় পরিচয়, সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ এবং নেতৃত্বের প্রশ্নে যে মতপার্থক্য দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে আসছিল, এই ঘটনাকে তারই নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনে দলীয় পরিচয় এবং সাংগঠনিক অধিকার নিয়ে যে আইনি ও রাজনৈতিক লড়াই চলছে, তার পাশাপাশি এবার দলীয় কার্যালয়কে কেন্দ্র করেও বিরোধ প্রকাশ্যে চলে এল। ফলে আগামী দিনে এই বিরোধ কেবল সাংগঠনিক স্তরেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি আইনি ও রাজনৈতিক সংঘাতে আরও বিস্তৃত হবে, সেদিকেই নজর রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের।

No comments:
Post a Comment