রাজ্যে দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় ৯ সপ্তাহের মধ্যেই পরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকীকরণে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। পরিবহন ভবনে ৪৩টি সিএনজি এবং ৭টি বৈদ্যুতিক (ইলেকট্রিক) বাসের উদ্বোধন করে তিনি জানান, সড়ক, রেল, জলপথ ও আকাশপথ— চার ক্ষেত্রেই পরিকাঠামো উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেবে রাজ্য সরকার।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মুখ্যসচিব মনোজ আগরওয়াল, পরিবহন সচিব রবীন্দর সিং এবং WBTC, NBSTC ও SBSTC-র শীর্ষ আধিকারিকরা। তাঁদের ধন্যবাদ জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা শুধু যাতায়াত সহজ করে না, শিল্প, বাণিজ্য ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিরও অন্যতম ভিত্তি তৈরি করে। তাই পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক গণপরিবহন গড়ে তোলাই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।
কেন্দ্র-রাজ্য সমন্বয়ে জোর, ঋণের বোঝা কাটানোর বার্তা
মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেন, আগের সরকারগুলির রেখে যাওয়া প্রায় ৮ লক্ষ কোটি টাকার ঋণের চাপ সামলেও উন্নয়ন থামানো হবে না। তাঁর বক্তব্য, কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে সমন্বয় বজায় রেখে কাজ করলে রাজ্যের পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং রাজস্ব বৃদ্ধি— দুই ক্ষেত্রেই ইতিবাচক ফল মিলবে।
তিনি জানান, কেন্দ্রীয় নগরায়ন মন্ত্রকের ৬০:৪০ অর্থায়ন মডেলের মাধ্যমে আরও সিএনজি ও ইলেকট্রিক বাস সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি কলকাতার পাশাপাশি NBSTC, WBTC ও SBSTC-র বিভিন্ন ডিপোতে ধাপে ধাপে চার্জিং স্টেশন তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মহিলাদের জন্য ‘পিঙ্ক কার্ড’, কন্ডাক্টরদের বেতন সমতা
মহিলাদের জন্য চালু হওয়া ‘জিরো ভ্যালু টিকিট’ ব্যবস্থার পাশাপাশি যাঁরা নিয়মিত টিকিট কেটে যাতায়াত করতে চান, তাঁদের জন্য ‘পিঙ্ক কার্ড’ চালুর প্রস্তুতির কথাও জানান মুখ্যমন্ত্রী। এই প্রকল্পে বছরে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
একই সঙ্গে তিনি ঘোষণা করেন, পূর্ববর্তী সময়ের বেতন বৈষম্য দূর করতে আগামী আগস্ট মাস থেকে বাস কন্ডাক্টরদের বেতন চালকদের সমপর্যায়ে আনার সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হবে।
ওয়াটার মেট্রো, সিটি মেট্রো ও নতুন বিমানবন্দর
পরিবহন ব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত করতে একাধিক নতুন প্রকল্পের কথাও তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, পশ্চিমবঙ্গকে দেশের ১৭তম ‘ওয়াটার মেট্রো’ পরিষেবার আওতায় আনার প্রাথমিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এছাড়া গার্ডেনরিচ থেকে হাওড়ার সাঁকরাইল-শিবপুর পর্যন্ত ‘রো-রো’ (Roll-on/Roll-off) পরিষেবা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে, যার ফলে কোনা এক্সপ্রেসওয়ের যানজট কমানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
দুর্গাপুর-আসানসোল এবং শিলিগুড়ি-জলপাইগুড়ি— এই দুই শহর জুটিকে সংযুক্ত করতে রাজ্য পরিচালিত ‘সিটি মেট্রো’ প্রকল্পের জন্য ডিপিআর (Detailed Project Report) তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এডিবি, বিশ্বব্যাঙ্ক বা হাডকোর মতো সংস্থার সহযোগিতা নেওয়ার সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, উত্তর ২৪ পরগনার কল্যাণীতে প্রায় ২,০০০ একর জমিতে একটি নতুন গ্রিনফিল্ড আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানান মুখ্যমন্ত্রী। পাশাপাশি বালুরঘাট, মালদা ও পুরুলিয়ায় অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর নির্মাণের ক্ষেত্রেও কেন্দ্রীয় সহায়তার আশ্বাস পাওয়া গেছে বলে দাবি করেন তিনি।
গেরুয়া রঙের নতুন বাস ও ১,০০০ বাসের লক্ষ্য
নতুন বাসগুলির রঙ নিয়েও মন্তব্য করেন শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর কথায়, স্বামী বিবেকানন্দ ও শ্রীচৈতন্যদেবের ঐতিহ্যকে সম্মান জানিয়ে WBTC-র নতুন বাসগুলিকে গেরুয়া (স্যাফরন) রঙে সাজানো হয়েছে।
সবশেষে তিনি জানান, মার্চ ২০২৭-এর মধ্যে রাজ্যের পরিবহন নিগমগুলির বহরে ১,০০০টি নতুন বাস যুক্ত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম পর্যায়ে ৪০০টি বাস কেনার টেন্ডার দ্রুত ডাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া তিনি দাবি করেন, অতীতের আর্থিক চাপ থাকা সত্ত্বেও বর্তমান সরকার উন্নয়নমূলক প্রকল্পগুলিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

No comments:
Post a Comment