নিজস্ব প্রতিবেদন: লিভার আমাদের শরীরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। খাবার হজম থেকে শুরু করে শরীরের বিষাক্ত পদার্থ বের করে দেওয়া, প্রোটিন তৈরি, শক্তি সঞ্চয়, ভিটামিন সংরক্ষণ—একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে এই অঙ্গ। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকলে একসময় সেখানে স্থায়ী দাগ বা ফাইব্রোসিস তৈরি হয়। সেই ক্ষতি যখন মারাত্মক আকার ধারণ করে এবং লিভারের স্বাভাবিক গঠন ও কার্যক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়, তখন তাকে বলা হয় লিভার সিরোসিস (Liver Cirrhosis)।
বিশেষজ্ঞদের মতে, লিভার সিরোসিস একদিনে হয় না। বছরের পর বছর ধরে লিভারের ক্ষতি হতে হতে এই রোগ তৈরি হয়। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক ক্ষেত্রেই রোগটির কোনও স্পষ্ট লক্ষণ থাকে না। ফলে রোগ ধরা পড়তে পড়তে অনেক সময় জটিলতা তৈরি হয়ে যায়। সেই কারণেই চিকিৎসকরা একে অনেক সময় 'নীরব ঘাতক' বলেও উল্লেখ করেন।
কেন হয় লিভার সিরোসিস?
একসময় মনে করা হতো, অতিরিক্ত মদ্যপানই লিভার সিরোসিসের প্রধান কারণ। কিন্তু বর্তমানে চিকিৎসকরা বলছেন, পরিস্থিতি অনেকটাই বদলেছে। এখন অ্যালকোহল ছাড়াও ফ্যাটি লিভার, ডায়াবেটিস, স্থূলতা, হেপাটাইটিস বি ও সি সংক্রমণ, কিছু অটোইমিউন রোগ এবং বংশগত অসুখও লিভার সিরোসিসের বড় কারণ হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ (NAFLD) এবং এর গুরুতর রূপ নন-অ্যালকোহলিক স্টিয়াটোহেপাটাইটিস (NASH) থেকে ধীরে ধীরে সিরোসিস হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
লিভার কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়?
লিভারে বারবার প্রদাহ বা আঘাত লাগলে শরীর সেই ক্ষত সারানোর চেষ্টা করে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে একই প্রক্রিয়া চলতে থাকলে সুস্থ লিভার কোষের জায়গায় শক্ত দাগযুক্ত টিস্যু তৈরি হয়। এই দাগ লিভারের রক্ত চলাচল ব্যাহত করে এবং ধীরে ধীরে লিভারের স্বাভাবিক কাজ বন্ধ হতে শুরু করে। একসময় লিভার ফেইলিওর পর্যন্ত হতে পারে।
কোন লক্ষণগুলি অবহেলা করবেন না?
রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে বিশেষ কোনও উপসর্গ নাও থাকতে পারে। তবে ধীরে ধীরে দেখা দিতে পারে—
সারাক্ষণ ক্লান্তি ও দুর্বলতা
ক্ষুধামন্দা
ওজন কমে যাওয়া
বমি বমি ভাব
পেটের ডানদিকে অস্বস্তি
হজমের সমস্যা
রোগ বাড়লে দেখা দিতে পারে—
চোখ ও ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া (জন্ডিস)
পেটে জল জমে যাওয়া (Ascites)
পা ফুলে যাওয়া
শরীরে সহজে রক্তক্ষরণ বা কালশিটে পড়া
হাতের তালু লাল হয়ে যাওয়া
ত্বকে মাকড়সার জালের মতো রক্তনালী দেখা যাওয়া
তীব্র চুলকানি
আচরণে পরিবর্তন, অতিরিক্ত ঘুম, বিভ্রান্তি বা স্মৃতিভ্রংশ
রক্তবমি বা কালো পায়খানা
এই লক্ষণগুলির কোনওটি দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
লিভার সিরোসিস কি সম্পূর্ণ ভালো হয়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, একবার সিরোসিস হয়ে গেলে লিভারে তৈরি হওয়া স্থায়ী দাগ পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফেরানো সম্ভব নয়। তবে রোগের কারণ নিয়ন্ত্রণ করা গেলে এবং সময়মতো চিকিৎসা শুরু হলে রোগের অগ্রগতি অনেকাংশে থামিয়ে রাখা যায়। অনেক রোগী দীর্ঘদিন স্বাভাবিক জীবনযাপনও করতে পারেন।
কী খাবেন?
চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাসে রাখতে হবে—
প্রচুর শাকসবজি
মৌসুমি ফল
সম্পূর্ণ শস্য
ডাল
পরিমিত পরিমাণে মাছ
পর্যাপ্ত জল
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার
কী খাবেন না?
অ্যালকোহল
ধূমপান
অতিরিক্ত তেল-মশলাযুক্ত খাবার
জাঙ্ক ফুড
কোমল পানীয়
অতিরিক্ত মিষ্টি
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনও ভেষজ বা ব্যথার ওষুধ
কীভাবে ঝুঁকি কমাবেন?
চিকিৎসকদের মতে, কয়েকটি অভ্যাস মেনে চললে লিভার সিরোসিসের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখুন
নিয়মিত শরীরচর্চা করুন
ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখুন
হেপাটাইটিস বি-র টিকা নিন
অ্যালকোহল এড়িয়ে চলুন
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করুন, বিশেষ করে ফ্যাটি লিভার থাকলে
কখন জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে যাবেন?
রক্তবমি হলে
কালো পায়খানা হলে
পেটে হঠাৎ অতিরিক্ত জল জমলে
অজ্ঞান হয়ে গেলে
তীব্র জন্ডিস হলে
আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন বা বিভ্রান্তি দেখা দিলে
চিকিৎসকদের মতে, লিভার সিরোসিস যত তাড়াতাড়ি ধরা পড়বে, ততই জটিলতা কমানোর সুযোগ বাড়বে। তাই দীর্ঘদিন ফ্যাটি লিভার, ডায়াবেটিস বা হেপাটাইটিসে ভুগলে নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ ও পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ডিসক্লেইমার: এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র সাধারণ স্বাস্থ্য-সচেতনতার উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি কোনওভাবেই চিকিৎসকের পরামর্শ বা রোগ নির্ণয়ের বিকল্প নয়। উপসর্গ দেখা দিলে বা লিভার সংক্রান্ত কোনও সমস্যা থাকলে অবশ্যই গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট বা হেপাটোলজিস্টের পরামর্শ নিন।

No comments:
Post a Comment