পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা প্যাকেটজাত দুধ এবং গরুর কাঁচা দুধের নমুনায় মাইক্রো-প্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। আন্তর্জাতিক পিয়ার-রিভিউড গবেষণা পত্রিকা Journal of Food Composition and Analysis-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে। খাদ্য নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য এবং দুগ্ধজাত খাদ্যের মান নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে এই গবেষণা।
গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন একাধিক গবেষক। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দেবাশিষ চট্টোপাধ্যায়, যিনি বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের স্কুলশিক্ষা দফতরের সিলেবাস-কাম-কারিকুলাম কমিটির চেয়ারপার্সন হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
গবেষণার জন্য রাজ্যের বিভিন্ন স্থান থেকে মোট নয়টি দুধের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে প্যাকেটজাত দুধের পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা গরুর কাঁচা দুধও ছিল। নমুনাগুলি বিশ্লেষণের জন্য মাইক্রোস্কোপিক পরীক্ষা, ফোরিয়ার ট্রান্সফর্ম ইনফ্রারেড স্পেকট্রোস্কপি (FTIR) এবং থার্মোগ্র্যাভিমেট্রিক অ্যানালিসিস (TGA)-সহ একাধিক আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।
পরীক্ষার ফলাফলে মোট ৬৬টি মাইক্রো-প্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছে। বিভিন্ন নমুনায় প্রতি লিটার দুধে ৩ থেকে ৩০টি পর্যন্ত প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। গড় হিসেবে প্রতি লিটারে প্রায় ১১টি কণার উপস্থিতি ধরা পড়েছে। গবেষকদের বিশ্লেষণে দেখা যায়, অধিকাংশ কণাই ছিল তন্তুর মতো (ফাইবার) অথবা ভাঙা টুকরো (ফ্র্যাগমেন্ট) আকৃতির।
পরীক্ষায় আরও জানা গেছে, শনাক্ত হওয়া প্লাস্টিকের বড় অংশই পলিইথিলিন (PE) এবং পলিপ্রোপিলিন (PP) দিয়ে তৈরি। এই দুই ধরনের প্লাস্টিক সাধারণত খাদ্য ও দুধের প্যাকেজিংয়ে ব্যবহৃত হয়। তাই গবেষকদের মতে, প্যাকেজিং উপকরণ দূষণের একটি সম্ভাব্য উৎস হতে পারে।
তবে গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, শুধু প্যাকেটজাত দুধ নয়, গরুর কাঁচা দুধেও একই ধরনের মাইক্রো-প্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ফলে দূষণের কারণ কেবল প্যাকেটজাত সংরক্ষণ নয়; দুধ উৎপাদন, দোহন, সংগ্রহ, পরিবহণ এবং সংরক্ষণের বিভিন্ন ধাপেও প্লাস্টিক কণা মিশে যেতে পারে বলে গবেষণায় ইঙ্গিত করা হয়েছে।
গবেষকদের দাবি, ভারতে দুধে মাইক্রো-প্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে এটি প্রথম প্রাথমিক বা বেসলাইন বৈজ্ঞানিক সমীক্ষাগুলির অন্যতম। যদিও নমুনার সংখ্যা সীমিত ছিল, তবুও ভবিষ্যতে বৃহত্তর পরিসরে গবেষণার জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে। গবেষণাপত্রে আরও বলা হয়েছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বেশি সংখ্যক নমুনা সংগ্রহ করে দূষণের উৎস, বিস্তার এবং দীর্ঘমেয়াদে মানবস্বাস্থ্যের উপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা করা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের গবেষণা খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, দুগ্ধজাত পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করা এবং প্লাস্টিক প্যাকেজিং সংক্রান্ত নীতি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

No comments:
Post a Comment