আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের আর্থিক দুর্নীতি ঘিরে ফের উত্তপ্ত রাজ্য রাজনীতি। প্রাক্তন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষকে ঘিরে তদন্ত, কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলির পদক্ষেপ এবং তৎকালীন প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে এবার সরাসরি প্রশ্ন তুললেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, আরজি করের আর্থিক অনিয়মের ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন বা ছাড়পত্র পেতে দীর্ঘ সময় লেগেছিল। তাঁর বক্তব্যে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
তবে বর্তমান তদন্তের নথিভুক্ত গতিপথ বলছে, বিষয়টি ইতিমধ্যেই বেশ কিছুটা এগিয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ED আরজি করের আর্থিক অনিয়ম ও অর্থপাচার সংক্রান্ত মামলায় প্রাক্তন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষ-সহ চার পক্ষের বিরুদ্ধে চার্জশিট জমা দেয়।
কী অভিযোগ উঠেছিল?
আরজি কর মেডিক্যাল কলেজের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ প্রথমে সামনে আসে সন্দীপ ঘোষের অধ্যক্ষ থাকাকালীন সময়ের বিভিন্ন প্রশাসনিক ও আর্থিক সিদ্ধান্তকে ঘিরে। হাসপাতালের প্রাক্তন ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট আখতার আলি এই অনিয়ম নিয়ে অভিযোগ তোলেন এবং কলকাতা হাই কোর্টে তদন্তের আবেদন করেন।
পরবর্তীতে আদালতের নির্দেশে CBI আর্থিক অনিয়মের তদন্ত হাতে নেয়। তদন্তে হাসপাতালের টেন্ডার, সরঞ্জাম ও ওষুধ কেনা, বিভিন্ন কাজের বরাত এবং আর্থিক লেনদেন নিয়ে একাধিক অভিযোগ খতিয়ে দেখা হয়।
CBI-এর পাশাপাশি অর্থের লেনদেনের দিকটি খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করে ED। তদন্তকারীদের অভিযোগের মধ্যে ছিল টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, নির্দিষ্ট সংস্থাকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়া এবং বেআইনি আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে অর্থ সরানোর সম্ভাবনা।
ED-এর চার্জশিটে কী রয়েছে?
২০২৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ED কলকাতার বিশেষ আদালতে চার্জশিট জমা দেয়। সেখানে সন্দীপ ঘোষকে অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তাঁর সঙ্গে ব্যবসায়ী ও সরবরাহকারী হিসেবে পরিচিত কয়েকজনের নামও উঠে আসে।
ED-এর অভিযোগ অনুযায়ী, হাসপাতালের বিভিন্ন কাজের বরাত দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল। তদন্তে কয়েক কোটি টাকার কাজের বরাত এবং কমিশনের অভিযোগও সামনে আসে। Indian Express-এর প্রতিবেদনে ED-এর চার্জশিটের ভিত্তিতে প্রায় ৬.৮৯ কোটি টাকার চুক্তি এবং ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কমিশনের অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
অবশ্য আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্তদের আইনগতভাবে দোষী বলা যায় না।
‘অনুমোদন আটকে ছিল’—শুভেন্দুর অভিযোগ
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্য, আগের সরকারের আমলে তদন্তকারী সংস্থাগুলির প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন পেতে দীর্ঘসূত্রিতা হয়েছিল। তাঁর অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে তৎকালীন প্রশাসনের সিদ্ধান্ত এবং তদন্তের গতি নিয়ে প্রশ্ন।
তবে বর্তমান পরিস্থিতি আগের অবস্থায় নেই। ২০২৬ সালের মে মাসে পশ্চিমবঙ্গ সরকার সন্দীপ ঘোষের বিরুদ্ধে ED-এর prosecution চালানোর জন্য আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেয়। এর ফলে সংশ্লিষ্ট আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পথ আরও পরিষ্কার হয়।
অর্থাৎ, “দেড় বছর ধরে ছাড়পত্র আটকে রয়েছে”—এই অভিযোগটি মূলত অতীতের প্রশাসনিক বিলম্বের দাবি হিসেবে দেখা উচিত; বর্তমানে সেই অনুমোদন দেওয়া হয়ে গেছে।
আরজি কর তদন্তে নতুন করে প্রশাসনিক পদক্ষেপ
আরজি কর-কাণ্ডে তদন্তের পরিধি আরও বাড়ানোর কথাও জানিয়েছে বর্তমান সরকার। দায়িত্বে থাকা কয়েকজন পুলিশ আধিকারিকের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সরকারি পদক্ষেপের মধ্যে তিন IPS আধিকারিক—বিনীত গোয়েল, ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় এবং অভিষেক গুপ্তকে ঘিরে তদন্ত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। তাঁদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কোনও গাফিলতি হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখার কথা জানানো হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, তদন্তের প্রয়োজনে তৎকালীন প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সূত্রও খতিয়ে দেখা হতে পারে। ফোন কল, হোয়াটসঅ্যাপ যোগাযোগসহ বিভিন্ন তথ্য তদন্তের আওতায় আসতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
অনন্ত মহারাজকে বঙ্গবিভূষণ দেওয়া নিয়েও প্রশ্ন
আরজি কর ইস্যুর পাশাপাশি বিজেপির রাজ্যসভার সাংসদ অনন্ত মহারাজকে বঙ্গবিভূষণ দেওয়ার বিষয়টিও রাজনৈতিক বিতর্কে উঠে এসেছে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত থেকে অনন্ত মহারাজ বঙ্গবিভূষণ সম্মান গ্রহণ করেছিলেন। রাজবংশী সম্প্রদায়ের জন্য তাঁর সামাজিক অবদানের কথা উল্লেখ করে তাঁকে এই সম্মান দেওয়ার কথা জানানো হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়ে তাঁর বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি বদলে যায়। ১৩ আগস্ট ২০২৬ পশ্চিমবঙ্গ সরকার অনন্ত মহারাজের কাছ থেকে বঙ্গবিভূষণ সম্মান প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয় বলে একাধিক প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে।
এই ঘটনাকেই সামনে রেখে শুভেন্দু অধিকারী প্রশ্ন তুলেছেন—যে ব্যক্তিকে নিয়ে এখন এত বিতর্ক, তাঁকেই অতীতে রাজ্যের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান দেওয়ার সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হয়েছিল?
রাজনৈতিক চাপানউতোর আরও বাড়ার আশঙ্কা
আরজি করের আর্থিক দুর্নীতি এবং মূল ধর্ষণ-খুনের তদন্ত—দুটি বিষয়ই গত দুই বছর ধরে বাংলার রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। আর্থিক দুর্নীতির মামলায় CBI ও ED-এর তদন্ত ইতিমধ্যেই আদালত পর্যন্ত গিয়েছে। ED চার্জশিট জমা দিয়েছে এবং রাজ্য সরকারের prosecution sanction-ও দেওয়া হয়েছে।
এর ফলে এখন মূল নজর আদালতের পরবর্তী প্রক্রিয়ার দিকে। তদন্তকারী সংস্থাগুলির অভিযোগ কতটা আদালতে প্রমাণিত হয়, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কীভাবে মামলা এগোয় এবং অতীতের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের জন্য কেউ দায়ী সাব্যস্ত হন কি না—সেদিকেই তাকিয়ে রাজনৈতিক মহল।
আরজি কর-কাণ্ডে ন্যায়বিচারের দাবিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক তরজা যে এখানেই থামছে না, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

No comments:
Post a Comment