জমি-দুর্নীতি মামলায় তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক ও সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রাক্তন ব্যক্তিগত সহকারী (পিএ) সুমিত রায় আপাতত বড় আইনি স্বস্তি পেলেন। বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্ট তাঁর বিরুদ্ধে কোনও ধরনের গ্রেফতারিমূলক পদক্ষেপে সাময়িক স্থগিতাদেশ জারি করেছে। ফলে মামলার পরবর্তী শুনানি না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে গ্রেফতার করা যাবে না।
তবে দেশের সর্বোচ্চ আদালত একই সঙ্গে স্পষ্ট জানিয়েছে, এই অন্তর্বর্তী সুরক্ষার অর্থ তদন্ত থেকে অব্যাহতি নয়। তদন্তকারী সংস্থা যখনই ডাকবে, সুমিত রায়কে হাজিরা দিতে হবে এবং তদন্তে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করতে হবে। আদালত আরও নির্দেশ দিয়েছে, প্রয়োজনে সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা যেতে পারে। অর্থাৎ, তদন্তের গতি বজায় রেখেই আপাতত তাঁর ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে।
সূত্রের খবর, প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চে এদিন মামলার শুনানি হয়। আদালত মামলার সমস্ত নথি পর্যালোচনা করে অন্তর্বর্তী রক্ষাকবচের নির্দেশ দেয়। আগামী সপ্তাহেই মামলার পরবর্তী শুনানি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যেখানে আদালত আরও বিস্তারিতভাবে বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে।
কীভাবে সুপ্রিম কোর্টে পৌঁছায় মামলা?
শালবনির কথিত জমি-প্রতারণা মামলায় গ্রেফতারির আশঙ্কায় প্রথমে কলকাতা হাইকোর্টে আগাম জামিনের আবেদন করেছিলেন সুমিত রায়। কিন্তু হাইকোর্ট সেই আবেদন খারিজ করে দেয়। অন্যদিকে, একটি পৃথক চাকরি-দুর্নীতির মামলায় তিনি শর্তসাপেক্ষে আগাম জামিন পান। আদালত তাঁকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তদন্তকারী আধিকারিকের সামনে হাজিরা দিয়ে সহযোগিতা করার নির্দেশ দেয়।
সুমিত রায়ের আশঙ্কা ছিল, চাকরি-দুর্নীতি মামলায় হাজিরা দিতে গেলে তাঁকে জমি-দুর্নীতি মামলায় গ্রেফতার করা হতে পারে। সেই আশঙ্কার ভিত্তিতেই তিনি জরুরি ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন। তাঁর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই শীর্ষ আদালত অন্তর্বর্তী সুরক্ষা প্রদান করে।
কী অভিযোগ উঠেছে?
তদন্তকারী সংস্থার দাবি, পশ্চিম মেদিনীপুরের শালবনি এলাকায় সরকারি জমি জাল নথি ও ভুয়ো কাগজপত্রের মাধ্যমে বেআইনিভাবে দখল ও বিক্রির একটি চক্র সক্রিয় ছিল। অভিযোগ, এই চক্রের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়েছে এবং একাধিক ব্যক্তি প্রতারিত হয়েছেন। তদন্ত চলাকালীন সুমিত রায়ের নাম সামনে আসে বলে তদন্তকারীদের দাবি। বিভিন্ন সাক্ষ্য, নথি ও অন্যান্য তথ্যের ভিত্তিতে তাঁর ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে তদন্তকারী সংস্থা আদালতে জানিয়েছে।
আদালতের অবস্থান
সুপ্রিম কোর্টের অন্তর্বর্তী নির্দেশে স্পষ্ট করা হয়েছে, তদন্তে কোনও বাধা সৃষ্টি করা যাবে না। প্রয়োজনে তদন্তকারীরা তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবেন এবং তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা করা তাঁর দায়িত্ব। একই সঙ্গে, পরবর্তী শুনানির আগে তাঁকে গ্রেফতার না করার নির্দেশ কার্যকর থাকবে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের অন্তর্বর্তী সুরক্ষা অভিযুক্তকে নির্দোষ ঘোষণা করে না। এটি কেবল মামলার পরবর্তী শুনানি পর্যন্ত ব্যক্তিগত স্বাধীনতা রক্ষার একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে তদন্তে প্রাপ্ত প্রমাণ, আদালতে উভয় পক্ষের যুক্তি এবং ভবিষ্যতের শুনানির ওপর।
রাজনৈতিক গুরুত্ব
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত সুমিত রায়ের নাম এই মামলায় উঠে আসায় রাজনৈতিক মহলেও বিষয়টি নিয়ে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। যদিও তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে বারবার দাবি করা হয়েছে, আইন তার নিজস্ব গতিতেই চলবে এবং আদালতের ওপর তাদের পূর্ণ আস্থা রয়েছে। অন্যদিকে বিরোধীরা এই ঘটনাকে ঘিরে রাজ্য সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
এখন কী?
পরবর্তী শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট অন্তর্বর্তী সুরক্ষার মেয়াদ বাড়াবে কি না, তদন্তের অগ্রগতি কী, এবং তদন্তকারী সংস্থা আদালতের সামনে কী তথ্য পেশ করে—সেদিকেই এখন নজর থাকবে। আপাতত সুমিত রায় গ্রেফতারি থেকে সুরক্ষা পেলেও, তদন্তে তাঁকে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করার নির্দেশ বহাল রয়েছে।

No comments:
Post a Comment