আইআইটি দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সামনে ছাত্রছাত্রীদের কীভাবে আচরণ করতে হবে, এমনকি তাঁকে মেডেল দেওয়ার সময় কতটা মাথা বা ঘাড় ঝুঁকিয়ে সম্মান জানাতে হবে—এমন নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে কিছু সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে। এই বিষয়টি নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন এআইএমআইএম প্রধান আসাদউদ্দিন ওয়াইসি।
ওয়াইসির দাবি, সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের নির্দেশ দেওয়া হলে তা প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা এবং সংবিধানের মৌলিক ভাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
কী নিয়ে বিতর্ক?
সম্প্রতি আইআইটি দিল্লির ৫৭তম সমাবর্তন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। অনুষ্ঠানে কৃতী ছাত্রছাত্রীদের বিভিন্ন সম্মান ও পদক প্রদান করা হয়।
কিছু সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীকে পদক দেওয়ার সময় ছাত্রছাত্রীদের কতটা মাথা বা ঘাড় ঝুঁকাতে হবে, সে বিষয়ে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি বৈদিক মন্ত্রপাঠের সময় উপস্থিত সবাইকে দাঁড়িয়ে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলেও ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
এই দাবিগুলির পরেই বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ওয়াইসি
সংবিধানের ২৮ নম্বর অনুচ্ছেদের প্রসঙ্গ
ওয়াইসি সংবিধানের ২৮ নম্বর অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করে বলেন, সরকারি অর্থে পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় শিক্ষা বা ধর্মীয় কার্যকলাপের বিষয়টি সংবিধানে নির্দিষ্টভাবে নিয়ন্ত্রিত।
তাঁর বক্তব্য, আইআইটি-র মতো সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যদি কোনও ধর্মীয় আচার বাধ্যতামূলক করা হয়ে থাকে, তাহলে তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
তবে এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—অনুচ্ছেদ ২৮ সব ধরনের ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা ধর্মীয় বিষয়কে একইভাবে নিষিদ্ধ করে না; এর প্রয়োগ প্রতিষ্ঠানের ধরন ও পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। তাই বিষয়টি নিয়ে চূড়ান্ত সাংবিধানিক সিদ্ধান্তের আগে পুরো নির্দেশ বা অনুষ্ঠানের প্রেক্ষাপট জানা প্রয়োজন।
বৈজ্ঞানিক মানসিকতার কথাও তুললেন ওয়াইসি
ওয়াইসি সংবিধানের ৫১এ(হ) ধারার কথাও উল্লেখ করেন। এই ধারায় নাগরিকদের মধ্যে বৈজ্ঞানিক মনোভাব, মানবতাবাদ এবং অনুসন্ধান ও সংস্কারের মানসিকতা গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে।
তাঁর বক্তব্য, প্রধানমন্ত্রীকে কতটা মাথা নত করে সম্মান জানাতে হবে বা বৈদিক মন্ত্রের সময় দাঁড়ানো বাধ্যতামূলক করা—এ ধরনের নির্দেশ বৈজ্ঞানিক ও আধুনিক চিন্তাধারার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
‘ভুলের প্রতিবাদ করাও দেশপ্রেম’
ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশে ওয়াইসি বলেন, দেশপ্রেম মানে শুধু সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া নয়। তাঁর মতে, সরকার কোনও ভুল সিদ্ধান্ত নিলে তার বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলাও দেশের স্বার্থ রক্ষার অংশ।
তিনি ছাত্রছাত্রীদের অন্যায় বা ভুলের প্রতিবাদ করতে এবং নিজেদের মত প্রকাশ করতে উৎসাহিত করেন।
কী হয়েছিল আইআইটি দিল্লির সমাবর্তনে?
আইআইটি দিল্লির ৫৭তম সমাবর্তন অনুষ্ঠানে তিন হাজারেরও বেশি ছাত্রছাত্রীকে ডিগ্রি দেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে ৫৮৭ জন ছিলেন পিএইচডি গবেষক।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী মোদি কৃতী ছাত্রছাত্রীদের বিভিন্ন পদক ও সম্মান প্রদান করেন এবং সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বক্তব্যও রাখেন।
ভবিষ্যৎ নিয়ে ছাত্রছাত্রীদের নানা চিন্তার প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী রসিকতা করে বলেন, তিনি ‘বাবা বাগেশ্বর’ নন যে ছাত্রছাত্রীদের মনের কথা পড়তে পারবেন। তবে প্রত্যেকের মনেই ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা প্রশ্ন ও পরিকল্পনা রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রীকে সামনে ছাত্রছাত্রীদের ‘কতটা ঝুঁকতে হবে’ বা বৈদিক মন্ত্রের সময় দাঁড়ানো বাধ্যতামূলক ছিল—এই দাবিগুলি মূলত সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্ট ও ওয়াইসির বক্তব্যের ভিত্তিতে সামনে এসেছে। বিষয়টি নিয়ে আইআইটি দিল্লি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোন মন্তব্য করে নি।

No comments:
Post a Comment