পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে শুক্রবার নতুন করে উত্তাপ ছড়াল দুটি পৃথক রাজনৈতিক বৈঠককে কেন্দ্র করে। একদিকে দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকারি বাসভবনে এনসিপিআই (NCPI)-এর একাংশের সাংসদদের সঙ্গে প্রাতঃরাশ বৈঠক, অন্যদিকে নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদলের আলোচনা—এই দুই ঘটনাকে ঘিরে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তৃণমূলের কালীঘাটপন্থী বিধায়ক কুণাল ঘোষ।
দিনভর রাজনৈতিক মহলে এই দুই বৈঠক নিয়ে জোর চর্চা চলার পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে কুণাল ঘোষ একাধিক বিস্ফোরক মন্তব্য করেন। তাঁর অভিযোগ, রাজ্যে বিরোধী রাজনীতির স্বাভাবিক গতিপথকে প্রভাবিত করার লক্ষ্যেই বিজেপি এবং তাদের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক শক্তিগুলির মধ্যে এক ধরনের সমঝোতা তৈরি হয়েছে। তাঁর দাবি, শুক্রবারের ঘটনাপ্রবাহ সেই রাজনৈতিক সমীকরণেরই ইঙ্গিত বহন করছে।
দিল্লির বৈঠকে উপস্থিত সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, কাকলি ঘোষ দস্তিদার, শতাব্দী রায় ও রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন কুণাল। তাঁর বক্তব্য, যে নেতারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন, তাঁদের রাজনৈতিক অবস্থান ও পদক্ষেপের মূল্যায়ন শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষই করবেন। ভবিষ্যতে ভোটের ময়দানে এই সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়তে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে নবান্নে হওয়া বৈঠক নিয়েও সরব হন কুণাল ঘোষ। তাঁর অভিযোগ, সরকারবিরোধী শক্তির পরিচয় দিলেও বাস্তবে কিছু রাজনৈতিক গোষ্ঠী বিজেপির রাজনৈতিক সুবিধা করে দেওয়ার মতো ভূমিকা পালন করছে। তাঁর ভাষায়, এই ধরনের রাজনৈতিক অবস্থান বিরোধী ভোটব্যাঙ্কে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে।
শুধু বিরোধী নেতাদের নয়, এদিন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকেও পরোক্ষে নিশানা করেন কুণাল। তিনি প্রশ্ন তোলেন, অতীতে বিভিন্ন আর্থিক কেলেঙ্কারি বা বিতর্কে নাম জড়ানো ব্যক্তিদের সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগ রেখে বিজেপি কীভাবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের দাবি করে। তাঁর বক্তব্য, যদি রাজনৈতিক শুদ্ধিকরণের কথা বলা হয়, তবে সেই নীতি সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত।
কুণাল ঘোষ আরও দাবি করেন, বাংলায় এমন একটি বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে, যারা শাসক দলের বিরুদ্ধে কার্যকর আন্দোলন গড়ে তুলতে পারবে না। তাঁর অভিযোগ, এর ফলে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক লড়াই দুর্বল হয়ে পড়তে পারে এবং বিরোধী রাজনীতির প্রকৃত চরিত্র ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
অন্যদিকে, দিল্লির বৈঠকে অংশ নেওয়া সাংসদদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাঁরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিভিন্ন জনস্বার্থের বিষয়, বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সমস্যা এবং রাজ্যের বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে আলোচনা করেছেন। একইভাবে নবান্নে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিনিধিদলও মুখ্যমন্ত্রীর কাছে একাধিক প্রশাসনিক ও জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট দাবি তুলে ধরেছে বলে জানা গিয়েছে। এই বৈঠকগুলিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ব্যাখ্যা ও পাল্টা ব্যাখ্যার লড়াই ইতিমধ্যেই তীব্র আকার ধারণ করেছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর বদলে যাওয়া রাজনৈতিক সমীকরণের আবহে বিরোধী শিবিরের ভাঙন, নতুন জোটের সম্ভাবনা এবং বিভিন্ন নেতার অবস্থান নিয়ে জল্পনা আরও বেড়েছে। ফলে শুক্রবারের এই দুই বৈঠক শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিক সৌজন্য সাক্ষাৎ হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং তা রাজ্যের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়েও নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
এদিকে কুণাল ঘোষের এই মন্তব্যের পর রাজনৈতিক মহলে পাল্টা প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষা শুরু হয়েছে। দিল্লি ও নবান্ন—দুই মঞ্চেই হওয়া বৈঠক ঘিরে আগামী দিনে রাজ্যের রাজনীতিতে আরও তীব্র বাকযুদ্ধের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

No comments:
Post a Comment