E20 পেট্রল নিয়ে দেশজুড়ে চলা বিতর্কের মধ্যেই সংসদে কেন্দ্রীয় সরকারের দেওয়া জবাব নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ইথানল মিশ্রিত এই জ্বালানি ব্যবহারে গাড়ির ইঞ্জিন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, মাইলেজ কমে যাওয়া কিংবা ফুয়েল সিস্টেমে সমস্যা তৈরি হওয়ার মতো অভিযোগ নিয়ে লোকসভায় প্রশ্ন তুলেছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তারই লিখিত জবাবে কেন্দ্র জানিয়েছে, E20 পেট্রলের কারণে ইঞ্জিনের ক্ষতি বা গাড়ির পারফরম্যান্সে গুরুতর অবনতির বিষয়ে কোনও প্রমাণিত ও বিস্তৃত অভিযোগের তথ্য সরকারের হাতে নেই।
৬ আগস্ট লোকসভায় এই জবাব দেন কেন্দ্রীয় পেট্রলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস প্রতিমন্ত্রী সুরেশ গোপী। মন্ত্রকের বক্তব্য অনুযায়ী, E20 ব্যবহারের সঙ্গে ইঞ্জিনের ক্ষয়, জ্বালানি ব্যবস্থার সমস্যা বা ওয়ারেন্টি সংক্রান্ত বড় ধরনের অভিযোগ রাজ্যভিত্তিক বা নির্দিষ্ট গাড়ির ভিত্তিতে সরকারের কাছে নথিভুক্ত হয়নি।
E20 পেট্রল আসলে কী?
E20 বলতে এমন পেট্রলকে বোঝানো হয়, যার সঙ্গে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত ইথানল মেশানো থাকে। পেট্রলের সঙ্গে ইথানল মেশানোর মূল উদ্দেশ্য হল আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেলের উপর নির্ভরতা কমানো এবং দেশে উৎপাদিত কৃষিজ কাঁচামাল থেকে তৈরি ইথানলের ব্যবহার বাড়ানো।
ভারতে গত কয়েক বছর ধরে ধাপে ধাপে ইথানল-ব্লেন্ডেড পেট্রলের ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে দেশের বহু পেট্রলচালিত গাড়ি ও দু-চাকার যান এই ধরনের জ্বালানি ব্যবহার করছে।
‘গাড়ির ইঞ্জিন নষ্ট হচ্ছে’—কতটা সত্য?
E20 নিয়ে সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্ন উঠেছে, তা হল এই জ্বালানি পুরনো গাড়ির ইঞ্জিনের ক্ষতি করে কি না।
লোকসভায় কেন্দ্রের বক্তব্য, নীতি আয়োগ, অটোমোবাইল শিল্পের বিভিন্ন সংস্থা এবং দেশের একাধিক প্রযুক্তিগত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা ও পরীক্ষার ভিত্তিতেই ইথানল-ব্লেন্ডেড পেট্রল কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়া হয়েছে।
সরকারের দাবি, ল্যাবরেটরি পরীক্ষা এবং বাস্তব পরিস্থিতিতে পরিচালিত পরীক্ষায় নির্ধারিত মানের E20 জ্বালানি ব্যবহারে গুরুতর ইঞ্জিন ক্ষতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পুরনো বা ‘লিগ্যাসি’ যানবাহনের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের অস্বাভাবিক ক্ষয়ের প্রমাণ মেলেনি বলে কেন্দ্র জানিয়েছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রতিটি গাড়িতে E20 ব্যবহারে মাইলেজ বা পারফরম্যান্সে কোনও পার্থক্যই হতে পারে না। গাড়ির মডেল, ইঞ্জিনের প্রযুক্তি, গাড়ির বয়স, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ব্যবহারের ধরন অনুযায়ী জ্বালানি দক্ষতায় কিছু পার্থক্য হতে পারে।
দেশে কত গাড়ি E20 ব্যবহার করছে?
কেন্দ্রীয় সরকারের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারতে কয়েক বছর ধরেই ১৫ শতাংশের বেশি ইথানল মিশ্রিত পেট্রল ব্যবহার হচ্ছে। পাশাপাশি গত কয়েক বছর ধরে E19-E20 মাত্রার ইথানল-ব্লেন্ডেড পেট্রলও বাজারে রয়েছে।
সরকারের দাবি, দেশে ২০ কোটিরও বেশি দু-চাকার যান এবং ৩ কোটিরও বেশি পেট্রলচালিত গাড়ি ইথানল মিশ্রিত জ্বালানি ব্যবহার করছে।
এত বিপুল সংখ্যক যানবাহনের মধ্যে E20 ব্যবহারের কারণে ইঞ্জিন বিকল হওয়া বা অস্বাভাবিক ক্ষয়ের কোনও প্রমাণিত জাতীয় স্তরের তথ্য পাওয়া যায়নি বলেই সংসদে জানিয়েছে কেন্দ্র।
মাইলেজ কমার প্রশ্নে কী বলছে সরকার?
E20 নিয়ে সাধারণ মানুষের অন্যতম বড় উদ্বেগ হল মাইলেজ। কারণ ইথানলের শক্তির ঘনত্ব পেট্রলের তুলনায় কম। ফলে একই পরিমাণ জ্বালানিতে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে জ্বালানি দক্ষতায় কিছুটা পার্থক্য দেখা দিতে পারে।
তবে কেন্দ্রের বক্তব্য হল, মাইলেজে কোনও পরিবর্তন থাকলেই সেটিকে ইঞ্জিনের ক্ষতি হিসেবে দেখা যাবে না। গাড়ির প্রযুক্তি, চালানোর ধরন, রাস্তার পরিস্থিতি, টায়ারের চাপ, গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ এবং ট্রাফিক—সবকিছুই মাইলেজের উপর প্রভাব ফেলে।
অর্থাৎ মাইলেজ কমে যাওয়া এবং ইঞ্জিন নষ্ট হওয়া—দুটি এক বিষয় নয়।
ইথানল মেশানোর পক্ষে কেন্দ্রের যুক্তি কী?
কেন্দ্র E20 কর্মসূচির অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সুবিধার কথাও সংসদে তুলে ধরেছে।
সরকারের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৪-১৫ অর্থবর্ষ থেকে ইথানল-ব্লেন্ডিং কর্মসূচির মাধ্যমে—
প্রায় ১.৯৭ লক্ষ কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
প্রায় ৩১৬ লক্ষ মেট্রিক টন অপরিশোধিত তেল আমদানির বিকল্প তৈরি হয়েছে।
প্রায় ৯৫২ লক্ষ মেট্রিক টন CO₂ নির্গমন এড়ানো সম্ভব হয়েছে বলে কেন্দ্রের দাবি।
ইথানল উৎপাদনের মাধ্যমে কৃষকদের কাছে প্রায় ১.৬৬ লক্ষ কোটি টাকা অতিরিক্ত আয় পৌঁছেছে বলে জানানো হয়েছে।
সরকারের যুক্তি, দেশের জ্বালানি আমদানির উপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি কৃষি অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রেও ইথানল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
পেট্রলে জল বা নিম্নমানের জ্বালানি নিয়ে অভিযোগ হলে কী করবেন?
কেন্দ্র জানিয়েছে, কোনও পেট্রল পাম্পে জ্বালানির গুণমান নিয়ে সন্দেহ হলে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করার ব্যবস্থা রয়েছে। তেল বিপণন সংস্থাগুলিকে নির্দিষ্ট মান ও নিয়ম মেনে জ্বালানি সরবরাহ করতে হয়।
বর্ষাকালে ভূগর্ভস্থ ট্যাঙ্কে জল ঢুকে জ্বালানির মান নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রুখতেও বিভিন্ন পাম্পে Automated Tank Gauging বা ATG প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা জানিয়েছে মন্ত্রক।
কোনও ট্যাঙ্কে অস্বাভাবিক মাত্রায় জল শনাক্ত হলে নির্দিষ্ট সুরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে সেখান থেকে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করার ব্যবস্থাও রয়েছে।
গ্রাহকের অভিযোগের ব্যবস্থা রয়েছে
E20 বা অন্য কোনও জ্বালানি ব্যবহারের পর গাড়িতে অস্বাভাবিক সমস্যা দেখা দিলে গ্রাহকরা বিষয়টি সংশ্লিষ্ট পেট্রল পাম্প বা তেল বিপণন সংস্থাকে জানাতে পারেন। প্রয়োজনে জ্বালানির নমুনা পরীক্ষা করার ব্যবস্থাও রয়েছে।
সরকারের বক্তব্য, অভিযোগের ভিত্তিতে জ্বালানির মান পরীক্ষা করে ত্রুটি প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
বিতর্কের মধ্যেও E20 নিয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট
E20 পেট্রল নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ পুরোপুরি উড়িয়ে না দিয়ে বলা যায়, বিষয়টি নিয়ে দুটি আলাদা প্রশ্ন রয়েছে—জ্বালানি দক্ষতায় পরিবর্তন এবং ইঞ্জিনের ক্ষতি। কেন্দ্রের সাম্প্রতিক সংসদীয় জবাব মূলত দ্বিতীয় প্রশ্নটির ক্ষেত্রে বলছে, E20 ব্যবহারের কারণে ব্যাপক বা প্রমাণিত ইঞ্জিন ক্ষতির তথ্য সরকারের কাছে নেই।
অন্যদিকে, কোন গাড়ি E20-এর জন্য প্রযুক্তিগতভাবে উপযুক্ত এবং কোন পুরনো মডেলে কী ধরনের জ্বালানি ব্যবহার করা উচিত—তা জানতে সংশ্লিষ্ট গাড়ি প্রস্তুতকারকের নির্দেশিকাই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ভিত্তি।
ফলে E20 নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়ানো যে কোনও দাবি বিশ্বাস করার আগে সরকারি তথ্য, গাড়ি প্রস্তুতকারকের নির্দেশিকা এবং নির্ভরযোগ্য প্রযুক্তিগত পরীক্ষার ফলাফল যাচাই করাই নিরাপদ।

No comments:
Post a Comment