ন্যাশনাল ডেস্ক, ২২ আগস্ট ২০২৬: চিনি কিনতে হাত পুড়ছে আমজনতার। এই কয়েকদিন প্রায় টাকা বেড়েছে চিনির দাম। দেশের বাজারে চিনির এই মূল্যবৃদ্ধির নেপথ্যে ইথানলের যোগসূত্রের দাবী নস্যাৎ করে দিল কেন্দ্রীয় সরকার। শুক্রবার এক বিবৃতিতে কেন্দ্র স্পষ্ট জানিয়েছে, চিনির মূল্য বৃদ্ধির জন্য ইথানলের উৎপাদন দায়ী নয়। উপভোক্তা বিষয়ক, খাদ্য ও গণবন্টন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে, দাম নিয়ন্ত্রণের জন্য চিনির মজুদের সীমা কঠোর করা হয়েছে এবং শুল্কমুক্ত আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সরকারের দাবী, উৎসবের মরসুমে চিনির সরবরাহ আরও বাড়বে, যার ফলে দাম কমবে।
উপভোক্তা বিষয়ক মন্ত্রণালয় একটি বিবৃতি জারি করে জানিয়েছে যে, চিনির মূল্যবৃদ্ধির জন্য ইথানলকে দায়ী করা যায় না। ২০২২-২৩ সালে ইথানলের জন্য ব্যবহৃত চিনির অংশ প্রায় ১২ শতাংশ থেকে কমে ২০২৫-২৬ সালে ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এছাড়াও, দেশে উৎপাদিত ইথানলের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ এখন শস্য, প্রধানত ভুট্টা থেকে আসে। সুতরাং, চিনির আকাশছোঁয়া দামের পেছনে ইথানলের কোনও ভূমিকা নেই।
মন্ত্রণালয়ের কথানুযায়ী, প্রত্যাশার চেয়ে কম অভ্যন্তরীণ উৎপাদন, উৎসবের মরসুমে বর্ধিত চাহিদা এবং আবহাওয়াজনিত কারণে আখের ফসলের ক্ষতি হওয়ায় চিনির দাম বেড়েছে। সরকার বিশ্বব্যাপী চিনির সরবরাহ ঘাটতি এবং শিল্পের কিছু অংশের ফটকাবাজি ও মজুতদারিকেও এই মূল্যবৃদ্ধির জন্য দায়ী করেছে।
সরকারের মতে, চলতি চিনি মরসুমে চিনির উৎপাদন ৩০৬ লক্ষ মেট্রিক টন হবে বলে আশা করা হচ্ছে, যেখানে প্রাথমিক অনুমান ছিল ৩৪৩ লক্ষ মেট্রিক টন। সরকারের দাবী, প্রত্যাশার চেয়ে কম উৎপাদন সত্ত্বেও, অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর জন্য দেশে পর্যাপ্ত চিনি রয়েছে, যা অক্টোবরে নতুন মাড়াই মরসুম শুরু হওয়া পর্যন্ত চলবে। মন্ত্রণালয়ের মতে, বিশ্বব্যাপী চিনির দামও বাড়ছে এবং এটি শুধু ভারতেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বব্যাপী চিনির ঘাটতি আনুমানিক ৩৩ লক্ষ মেট্রিক টন বলে অনুমান করা হচ্ছে।
ভোক্তা বিষয়ক মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে, ইথানল কর্মসূচি কৃষকদের উপকৃত করেছে এবং চিনিকলগুলোকে শক্তিশালী করেছে। দেশে সাধারণত ৩২০-৩৪০ লক্ষ মেট্রিক টন চিনি উৎপাদিত হয়, যেখানে অভ্যন্তরীণ চাহিদা প্রায় ২৮০-২৯০ লক্ষ মেট্রিক টন। যে বছরগুলোতে ফলন বেশি হয়, সে বছরগুলোতে অতিরিক্ত মজুত চিনিকলগুলোর তহবিল আটকে দেয় এবং আখচাষিদের পাওনা পরিশোধে দেরি করতে পারে। অতিরিক্ত চিনিকে ইথানলে রূপান্তর করার ফলে এই সমস্যার সমাধান হয়েছে এবং চিনিকলগুলোর আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটেছে।
সাম্প্রতিক তথ্য মতে, খুচরা বাজারে চিনির দাম চড়চড়িয়ে বেড়েছে। ২০ জুলাই প্রতি কেজি চিনির গড় খুচরো বাজারে চিনির দাম ছিল ৪৮.১৮ টাকা, যা ২০ আগস্ট বেড়ে ৫৫.৭০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। সরকারের মতে, সরবরাহ ও চাহিদার প্রভাবেই এই মূল্যবৃদ্ধি। সরকার প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ফসলের ক্ষতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির সীমিত জোগানের বিষয়টিও উল্লেখ করেছে কেন্দ্রের বিবৃতিতে। একই সঙ্গে, সংশ্লিষ্ট শিল্পের একটি অংশের মধ্যে অতিরিক্ত মজুতের প্রবণতার কারনে দেশীয় বাজারে চিনি সরবরাহে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
আসন্ন উৎসবের মরশুমে যাতে চিনির দাম হাতের বাইরে না চলে যায়, সেটা নিশ্চিত করতে সরকার মজুদদারি কড়া হাতে রুখতে চাইছে। কেন্দ্রের নয়া নির্দেশ, বড় বড় চিনি ব্যবসায়ী বা মজুতদাররা ১৫ দিনের বেশি চিনি গুদামে আটকে রাখতে পারবেন না। মোদি সরকারের নতুন নির্দেশিকা বলছে, যে সব ব্যবসায়ীরা মাসে ১০ মেট্রিক টনের বেশি চিনি কেনাবেচা করেন, তাঁদের প্রতি ১৫ দিনের মধ্যে নিজেদের গুদামে মজুত সব চিনি বাজারে ছাড়তে হবে। সেটা নিশ্চিত করতে ১৫ দিন অন্তর অন্তর অভিযান চালাবে সরকার। আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে এই বিধিনিষেধ চালু হবে। সেটা চলবে ৩০ নভেম্বর অর্থাৎ উৎসবের মরসুম শেষ হওয়া পর্যন্ত।
সংবাদসংস্থা রয়টার্স আগেই দাবী করেছে, দেশের বাজারে চিনির সংকট মেটাতে কার্যত নজিরবিহীন পদক্ষেপের পথে হাঁটতে চলেছে সরকার। ভারত প্রায় ১০ বছর বাদে চিনি আমদানি করতে পারে । চাঞ্চল্যকর বিষয় হল, চিনি উৎপাদনে এতদিন যে ভারত শুধু স্বাবলম্বী ছিল তাই নয়, প্রতি বছর বড় অঙ্কের চিনি রপ্তানিও করত। কিন্তু এ বছর ইথানল উৎপাদনের জোরাল ধাক্কায় এতটাই অভূতপূর্ব সংকটের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে বিদেশ থেকে প্রচুর চিনি আমদানির কথা ভাবতে হচ্ছে।
আসলে গোটা বিশ্বে চিনির চাহিদা ভারতেই সবচেয়ে বেশি। এছাড়া সামনে উৎসবের মরসুম আসছে। দুর্গাপুজো, দিওয়ালির মতো অনুষ্ঠানে চিনির চাহিদা আরও বেড়ে যাবে। এখন থেকে দাম নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে আগামী দিনে চিনিতে হাত দেওয়াই মুশকিল হয়ে দাঁড়াবে। চিনির দাম বাড়লে বহু খাদ্যসামগ্রীর দামই বেড়ে যেতে পারে। এর জেরে সমস্যায় পড়তে পারেন মিষ্টি ব্যবসায়ীরা। ফলে সার্বিকভাবে দেশের বাজারে বড়সড় ধাক্কার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এদিকে ছাত্র ইস্যুতে সরকারের বিরুদ্ধে সুর চড়ানোর পর কংগ্রেস, পেট্রোলে ২০ শতাংশ ইথানল মিশ্রণের বিরুদ্ধেও তাদের প্রচারণা জোরদার করেছে। দলটি দাবী করেছে যে, সরকার অবিলম্বে ই-২০ নীতি পর্যালোচনা করুক এবং গ্রাহকদের ইথানল মিশ্রণ ছাড়া পেট্রোল সরবরাহ করুক। দলটির অভিযোগ, বিজেপি-নেতৃত্বাধীন সরকারের এই নীতির কারণে সাধারণ মানুষকে খাদ্য ও যাতায়াত উভয়েরই চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে। দলের সাধারণ সম্পাদক জয়রাম রমেশ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ একটি পোস্টে বলেছেন যে, একটি জনবিরোধী জ্বালানি নীতি যা যানবাহন এবং রান্না উভয়কেই ব্যয়বহুল করে তোলে, তা দেশের জন্য অগ্রহণযোগ্য। ইথানল উৎপাদনে আখ এবং শস্যের ব্যবহার খাদ্যদ্রব্যের দামকে প্রভাবিত করেছে।

No comments:
Post a Comment