খাবারে অনীহা নাকি গুরুতর অসুখ? শিশুদের এই লক্ষণ কখনও অবহেলা করবেন না - Press Card News

Breaking

Post Top Ad

Post Top Ad

Wednesday, July 1, 2026

খাবারে অনীহা নাকি গুরুতর অসুখ? শিশুদের এই লক্ষণ কখনও অবহেলা করবেন না


 অনেক অভিভাবকেরই অভিযোগ, খাবারের সময় এলেই সন্তান নানা অজুহাতে খাওয়া এড়িয়ে চলে। কেউ শুধু ভাত খেতে চায়, কেউ আবার জাঙ্ক ফুড ছাড়া অন্য কিছু মুখেই তোলে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটিকে শিশুর জেদ, খামখেয়ালিপনা বা বদঅভ্যাস বলে ধরে নেওয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, এটি সবসময় সাধারণ অভ্যাস নয়; অনেক সময় এটি একটি গুরুতর খাদ্যজনিত মানসিক সমস্যার লক্ষণ হতে পারে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই সমস্যার নাম অ্যাভয়ড্যান্ট রেস্ট্রিকটিভ ফুড ইনটেক ডিসঅর্ডার (ARFID)। এই সমস্যায় আক্রান্ত শিশু খাবারের নির্দিষ্ট স্বাদ, গন্ধ, রং বা গঠনের কারণে, কিংবা অতীতে খাবার গলায় আটকে যাওয়ার মতো কোনো ভয়ের অভিজ্ঞতার কারণে অনেক ধরনের পুষ্টিকর খাবার খেতে অস্বীকার করে। এর ফলে শিশুর উচ্চতা, ওজন, মস্তিষ্কের বিকাশ, পড়াশোনা এবং সামাজিক আচরণ—সবকিছুর ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। সম্প্রতি গবেষকেরা এই রোগের চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির কথা জানিয়েছেন।

শিশুদের মধ্যে ARFID-এর লক্ষণ ও ঝুঁকি

চিকিৎসকদের মতে, এই সমস্যা যে কোনো বয়সে দেখা দিলেও শিশুদের মধ্যে এটি বেশি দেখা যায়। এতে শিশুদের মধ্যে খাবার নিয়ে অকারণ ভয় বা তীব্র অনীহা তৈরি হয়।

পুষ্টির ঘাটতি

সময়মতো রোগটি শনাক্ত না হলে শরীরে আয়রন, ভিটামিন, প্রোটিনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে পুষ্টিকর সাপ্লিমেন্ট বা টিউবের মাধ্যমে খাবার দেওয়ারও প্রয়োজন হতে পারে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ARFID-এ আক্রান্ত অনেক শিশুর মধ্যে উদ্বেগজনিত সমস্যা (Anxiety), অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার (Autism Spectrum Disorder) এবং এডিএইচডি (ADHD)-এর মতো অবস্থাও থাকতে পারে।

চিকিৎসায় বড় সাফল্য

সম্প্রতি প্রকাশিত একটি গবেষণায় প্রথমবারের মতো ARFID-এর চিকিৎসা বৈজ্ঞানিকভাবে র‌্যান্ডমাইজড কন্ট্রোল্ড ট্রায়াল পদ্ধতিতে মূল্যায়ন করা হয়েছে।

৬ থেকে ১২ বছর বয়সী ৯৮ জন শিশুর ওপর পরিচালিত এই গবেষণায় দেখা গেছে, সঠিক চিকিৎসা ও পারিবারিক সহযোগিতার মাধ্যমে শিশুদের খাদ্যাভ্যাসে উল্লেখযোগ্য উন্নতি সম্ভব। গবেষণার প্রধান গবেষক জেমস লকের মতে, এখন এই রোগের কার্যকর চিকিৎসার জন্য যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক তথ্য পাওয়া গেছে।

দুটি বিশেষ থেরাপিতে মিলেছে আশাব্যঞ্জক ফল

গবেষণায় চার মাস ধরে অনলাইনের মাধ্যমে শিশুদের দুটি ভিন্ন ধরনের থেরাপি দেওয়া হয়, যার ফলাফল ছিল ইতিবাচক।

১. পারিবারিকভিত্তিক থেরাপি

এই থেরাপিতে বাবা-মা এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বিশেষজ্ঞরা শেখান, কীভাবে কোনো চাপ সৃষ্টি না করে ধীরে ধীরে শিশুর খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করা যায়। এতে অভিভাবকেরা বুঝতে পারেন, শিশুটি ইচ্ছাকৃতভাবে খাবার এড়িয়ে যাচ্ছে না; এটি একটি বাস্তব চিকিৎসাজনিত সমস্যা। এই পদ্ধতিতে অনেক শিশুর ওজনও বাড়তে দেখা গেছে।

২. ব্যক্তিগত অনুপ্রেরণামূলক থেরাপি

এই পদ্ধতিতে খেলা, বিভিন্ন সৃজনশীল কার্যকলাপ এবং কল্পনার রেস্তোরাঁ তৈরির মতো আনন্দদায়ক উপায়ে শিশুদের নতুন নতুন খাবার চেখে দেখতে উৎসাহিত করা হয়। এর ফলে খাবারের প্রতি তাদের আগ্রহ ও কৌতূহল ধীরে ধীরে ফিরে আসে।

চিকিৎসকদের পরামর্শ

শিশু বিশেষজ্ঞদের মতে, ARFID-কে কখনোই সাধারণ খাওয়ার অনীহা বা বদঅভ্যাস ভেবে অবহেলা করা উচিত নয়। এটি একটি বাস্তব শারীরিক ও মানসিক সমস্যা। তবে সুখবর হলো, সময়মতো সঠিক পরামর্শ, উপযুক্ত থেরাপি এবং পরিবারের ইতিবাচক সহযোগিতা পেলে অধিকাংশ শিশুই ধীরে ধীরে স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাসে ফিরে আসতে পারে এবং সুস্থ জীবনযাপন করতে সক্ষম হয়।

No comments:

Post a Comment

Post Top Ad