ফুসফুস ও শ্বাসতন্ত্রের রোগ বর্তমানে বিশ্বজুড়ে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। বিশ্বব্যাপী প্রায় ৫৬ কোটি ৯০ লক্ষ মানুষ বিভিন্ন শ্বাসতন্ত্রজনিত রোগে আক্রান্ত এবং প্রতি বছর এক কোটিরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয় এসব রোগে। এর মধ্যে হাঁপানি, ফুসফুসের ক্যানসার, যক্ষ্মা, নিউমোনিয়াসহ নিম্ন শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ এবং ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি) সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। বায়ুদূষণ, ধূমপান এবং বংশগত কারণের জন্য এসব রোগের প্রকোপ ক্রমেই বাড়ছে।
এসবের মধ্যে ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি) সবচেয়ে প্রাণঘাতী রোগগুলোর একটি। বিশ্বজুড়ে ২১ কোটিরও বেশি মানুষ এই রোগে ভুগছেন। এটি বিশ্বে মৃত্যুর তৃতীয় প্রধান কারণ এবং প্রতি বছর প্রায় ৩৭ লক্ষ মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়। উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব মৃত্যুর ৯০ শতাংশেরও বেশি ঘটে উন্নয়নশীল ও নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে।
সিওপিডি কী এবং কেন এটি এত বিপজ্জনক?
সিওপিডি ফুসফুসের শ্বাসনালিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ সৃষ্টি করে। ফলে বাতাস চলাচলের পথ সংকুচিত হয়ে যায় এবং রোগীর স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়।
এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির দীর্ঘদিনের কাশি, কফ, বুকে চাপ বা ভারী অনুভূতি এবং সামান্য হাঁটাহাঁটিতেই শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। এতদিন পর্যন্ত এই রোগের কোনো স্থায়ী চিকিৎসা ছিল না। রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইনহেলার বা স্টেরয়েডের মতো ওষুধ ব্যবহার করা হতো। তবে এবার চিকিৎসাবিজ্ঞানে এসেছে একটি নতুন আশার খবর, যা সিওপিডির চিকিৎসায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
চিকিৎসা ব্যয়ে বিপুল অর্থনৈতিক চাপ
সিওপিডি শুধু রোগীর শারীরিক ক্ষতিই করে না, বিশ্ব অর্থনীতির ওপরও বিশাল চাপ সৃষ্টি করে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই রোগের চিকিৎসায় বিশ্বজুড়ে বছরে প্রায় ৭৭৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন এই চিকিৎসা পদ্ধতি চালু হলে ভবিষ্যতে এই ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হতে পারে।
ডুপিলুম্যাব ইনজেকশন: চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন সম্ভাবনা
সিওপিডি রোগের চিকিৎসায় প্রথমবারের মতো যুক্তরাজ্যে ডুপিলুম্যাব (Dupilumab) নামের একটি নতুন ইনজেকশন ব্যবহার শুরু হয়েছে।
চিকিৎসকদের মতে, এই ওষুধ ফুসফুসের কার্যক্ষমতা উন্নত করতে সাহায্য করে এবং রোগ হঠাৎ মারাত্মকভাবে বেড়ে যাওয়ার (এক্সাসারবেশন) ঝুঁকি প্রায় ৩৩ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে। ফলে রোগীদের বারবার হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজনও কমে আসতে পারে।
যদিও এটি সিওপিডির স্থায়ী চিকিৎসা নয়, তবুও গত কয়েক দশকের মধ্যে শ্বাসতন্ত্রের চিকিৎসায় এটিকে অন্যতম বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কীভাবে কাজ করে এই ইনজেকশন?
ডুপিলুম্যাব শরীরের এমন কিছু নির্দিষ্ট প্রোটিনকে লক্ষ্য করে কাজ করে, যা ফুসফুসে প্রদাহ সৃষ্টি করে। প্রদাহ কমে গেলে কফ উৎপাদনও কমে এবং শ্বাসনালি কিছুটা প্রসারিত হয়। ফলে রোগীর শ্বাস নিতে সুবিধা হয়। সাধারণত প্রতি দুই সপ্তাহে একবার এই ইনজেকশন দেওয়া হয়।
প্রথম রোগীর অভিজ্ঞতা
এই নতুন চিকিৎসার প্রথম ডোজ দেওয়া হয়েছে যুক্তরাজ্যের দক্ষিণ-পূর্ব লন্ডনের ৬৭ বছর বয়সি প্যাট্রিক রেগানকে। তিনি গত ১৫ বছর ধরে সিওপিডিতে ভুগছেন।
প্যাট্রিক জানান, এই রোগের কারণে তাঁর স্বাভাবিক জীবনযাপন প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এমনকি নাতি-নাতনিদের সঙ্গে হাঁটতেও যেতে পারতেন না। তাঁর আশা, এই নতুন ইনজেকশন তাঁর দৈনন্দিন জীবনকে অনেকটাই সহজ করে তুলবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ওষুধের পাশাপাশি ধূমপান সম্পূর্ণ ত্যাগ, দূষণ থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকা, সুষম খাদ্য গ্রহণ এবং নিয়মিত হালকা ব্যায়াম করলে সিওপিডির ঝুঁকি ও জটিলতা অনেকটাই কমানো সম্ভব।

No comments:
Post a Comment