কলকাতা: রাজ্যে পালাবদলের পর একের পর তৃণমূল নেতা গ্ৰেফতার হচ্ছেন। যাঁদের ভয়ে এতদিন কেউ মুখ খুলতে পারছিলেন না বলে অভিযোগ, সেই তাবড় তাবড় নেতাদের বিরুদ্ধেই আছড়ে পড়ছে জনরোষ। এমনকি গ্ৰেফতার হতেই তাঁদের লক্ষ্য করে উড়ে আসছে ডিম-জুতো। এবার জনরোষের মুখে স্বরূপ বিশ্বাস। তিনি গ্রেফতার হতেই জনগণের জমা ক্ষোভের বিস্ফোরণ। সেই আঁচ গিয়ে পৌঁছেছে দক্ষিণ কলকাতার অন্যতম নামজাদা সুরুচি সংঘে।
এই ক্লাবের দুর্গাপুজোর খ্যাতি বিশ্বজোড়া। বরাবরই এই ক্লাবের সঙ্গে জুড়ে ছিল রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের নাম। জুড়েছে ভাই স্বরূপ বিশ্বাসের নামও। প্রধান দুই উদ্যোক্তার একজন এখন পুলিশের হেফাজতে। অন্যজনকেও ডেকে পাঠিয়েছে পুলিশ। আর তারপরেই দক্ষিণ কলকাতার অন্যতম নামজাদা সুরুচি সংঘে আছড়ে পড়ল জনরোষ। শুক্রবার তালা ভেঙে ভাঙচুর উত্তেজিত জনতার। ক্লাবের ভিতরে বৈভবের একেবারে ঘনঘটা। কলেজের পর ক্লাবে ভিতরেও দেখা মিলল বিলাসবহুল বেডরুম। সেখানেই কিং সাইজ খাট, এদিক ওদিকে পড়ে রইছে আইফোন, আইপ্যাডের প্যাকেট। দেখা গেল প্রচুর দামি দামি শাড়ি। এমনকি শৌচালয়ের মাথাতেও ঘুরছে পাখা।
যে ক্লাবে এই কয়েক মাস আগেই কয়েক কিলোমিটার লম্বা লাইন দিয়ে দুর্গা ঠাকুর দেখেছেন মানুষ, দূর দূরান্ত থেকে ছুটে এসেছেন দর্শনার্থীরা সেই ক্লাবকেই ঘিরে এবার ক্ষোভের বিস্ফোরণ। এলাকার এক মহিলা বলেন, 'নিচে দেখে মনে হবে ক্লাব ঘর। আর উপরে উঠলেই অবাক হয়ে যাবেন। ওরা সাধারণ মানুষকে অত্যাচার করছে, আর এখানে মধুচন্দ্রিমা করছে। আমরা কোনওদিন এই ঘরের খোঁজই পাইনি।'
পাশে দাঁড়িয়ে আর এক মহিলা বলেন, 'পাড়ার লোক হওয়ার পরেও এই ক্লাবে ঢোকার অনুমতি ছিল না।' আর এক মহিলার অভিযোগ, এই রুম দীর্ঘদিন থেকে ব্যবহার হয়েছে। এসিও ছিল। সব খুলে নিয়েছে। অন্যদিকে ক্লাবের ভিতরে আগের পুরসভা নির্বাচন সংক্রান্ত বেশ কিছু নথিপত্রেরও সন্ধান মিলেছে। দেখা মিলেছে পোলিং এজেন্টের নির্দেশিকা সংক্রান্ত তথ্যের। তৃণমূলের তরফে পোলিং এজেন্টেদের যে সমস্ত তথ্য দেওয়া হয়েছিল সেরকম অনেক কিছুরই দেখা মিলেছে। পাশাপাশি ভোটার লিস্টেরও দেখা মিলেছে। অভিনেতা হওয়ার জন্য, সিনেপাড়ায় কাজের জন্য বেশ কিছু আবেদনকারীর বায়োডেটারও দেখা মিলেছে। উদ্ধার হয়েছে যুবসাথীর ফর্মও। এসব এতদিন এই ক্লাব ঘরে কি করছিল? উঠছে প্রশ্ন।
এদিকে, স্বরূপের দুর্নীতির আঁচ গিয়ে পড়েছে তাঁর 'শিষ্যে'র ওপরেও। এদিন তাঁকে ধাওয়া করে বেধড়ক মারধর করেন একদল উত্তেজিত জনতা। কিল, চড়, ঘুষি মারা হয় বলেও অভিযোগ। নিউ আলিপুর থানায় ঢুকে রক্ষা পান তিনি।
উল্লেখ্য, টলিপাড়ার দীর্ঘদিনের ক্ষোভ বিশ্বাস ব্রাদার্সের ওপর। দাদা অরূপ বিশ্বাসের ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে টলিউডে একছত্র আধিপত্য বিস্তার করে বসেছিলেন স্বরূপ, এমন অভিযোগ ছিলই। এমনকি অভিনেতা-অভিনেত্রী থেকে কলাকুলশী, সকলেই তাঁর অত্যাচারের শিকার। অবশেষে এক মেকআপ আর্টিস্টের অভিযোগের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার রাতে গ্রেফতার করা হয় স্বরূপকে।
অভিযোগকারিনী জানান, দু'বছর ধরে কোনও কাজ পাননি বরং কাজ চাইতে গেলে পালটা তাঁর কাছ থেকে টাকা দাবী করা হয়। শুধু তাই নয়, টাকা না দিলে ভবিষ্যতে কাজ দেওয়া হবে না বলেও জানানো হয়। এরপর দু'বছর পর ফের কাজের খোঁজে স্বরূপ বিশ্বাসের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাঁকে শ্লীলতাহানি করা হয় বলে অভিযোগ। গ্রেফতারের পর শুক্রবার আদালতে তোলা হলে স্বরূপকে ১৪ দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দেওয়া হয়।
প্রসঙ্গত, কয়েকদিন আগেই সুরেন্দ্রনাথ কলেজে বিলাসবহুল কক্ষের হদিশ মেলে। ঘর থেকে অনেক আপত্তিকর জিনিসও উদ্ধার হয়।

No comments:
Post a Comment