কলকাতা: তৃণমূল শিবিরে বড়সড় ধাক্কা। সমস্ত জল্পনা সত্যি করে সংসদীয় দলেও বড় ফাটল। রাজ্যসভার সাংসদ পদ থেকে ইস্তফা দিলেন সুখেন্দু শেখর রায়। পাশাপাশি দল থেকেও ইস্তফা দিয়েছেন বলে জানান তিনি। সোমবার সকালেই তাঁর এই পদত্যাগ। এর পরেই দলের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক এই মন্তব্য করেন তিনি। সুখেন্দু শেখর বলেন, 'দীর্ঘদিন ধরেই দলে কোণঠাসা। সঠিক সময়ের অপেক্ষা করছিলাম।' দলের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ করেছেন তিনি। পাশাপাশি দলে ব্যাপক দুর্নীতি থেকে শুরু করে আরজি কর প্রসঙ্গও তুলে ধরেন।
সুখেন্দু শেখর রায় এদিন সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বলেন, 'যখনই প্রশাসক মানুষের ভাষা বুঝতে অক্ষম হয়, তখনই তার পতন অনিবার্য।' তিনি বলেন, 'তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছি। দল থেকেও পদত্যাগ করেছি।পরাজয়ের পর কোনও কারণ অনুসন্ধান করা হয়নি। মানুষ একটা দলের ওপর অনাস্থা দেখিয়েছেন। মানুষের সঙ্গে এই দলের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে।'
দলের নীতিগত বিচ্যুতি নিয়ে তিনি বলেন, 'সাধারণ মানুষ এই দলের ওপর থেকে সম্পূর্ণ আস্থা হারিয়েছেন। আমজনতার সঙ্গে দলের নিচুতলার যোগাযোগ এখন পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন। একদা সিপিএম-কে ক্ষমতাচ্যুত করে বাংলায় পরিবর্তন আনাই ছিল এই দলের মূল কর্মসূচি। কিন্তু সময় যত গড়িয়েছে, দেখা গিয়েছে দলের দুর্নীতি কালক্রমে প্রাতিষ্ঠানিক চেহারা নিয়েছে।'
তাঁর আরও অভিযোগ, দলের মূল লক্ষ্য ছিল বামফ্রন্ট সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে নিজে ক্ষমতায় আসা। আদর্শের পরিবর্তে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যই বেশি প্রাধান্য পেয়েছিল বলে দাবী করেন তিনি। সুখেন্দুশেখরের মতে, “ক্ষমতায় আসার পর লুটপাটের রাজনীতি শুরু হয়। তখন সাধারণ মানুষ বা আমরাও বিষয়টি পুরোপুরি বুঝতে পারিনি।"
এখানেই থামেননি তিনি। তৃণমূলের জাতীয় স্তরের নেতাদের আর্থিক সততা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলে তাঁর দাবী, “তৃণমূলের সমস্ত জাতীয় নেতার সম্পত্তির উৎস খতিয়ে দেখা উচিৎ। এই মুহূর্তে সব কিছুর একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ অডিট হওয়া অত্যন্ত জরুরি।”
অতীতে আরজি কর হাসপাতালের নৃশংস ঘটনা নিয়ে দলীয় অবস্থানের বাইরে গিয়ে যে প্রতিবাদের সুর তিনি বেঁধেছিলেন, এদিনও সেই অবস্থানেই অনড় থেকেছেন তিনি। তিনি বলেন, "আরজি কর কাণ্ড নিয়ে আমি প্রথম থেকেই সরব হয়েছিলাম, দলের ঊর্ধ্বে গিয়ে আলাদাভাবে ধর্নাতেও বসেছিলাম। কারণ সাধারণ মানুষ এই ঘটনার প্রকৃত বিচার চেয়েছিলেন এবং বিশ্বজুড়ে এই বর্বরতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আছড়ে পড়েছিল।”
সুখেন্দু শেখর রায়ের দাবী, তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দুর্নীতির বীজ বপন হয়েছিল। ২০১১ সালের পর ডেলো পাহাড়ে এক চিটফান্ড কর্ণধারের সঙ্গে বিতর্কিত বৈঠকের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সেই সময় থেকেই নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছিল। পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আঁকা ছবি উচ্চমূল্যে বিক্রির ঘটনাও উল্লেখ করেন তিনি।
সদ্য প্রাক্তন সাংসদের কথায়, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি ১০-১৫ লক্ষ টাকায় বিক্রি হয়েছে। কেউ কেউ তাঁকে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির সঙ্গেও তুলনা করেছেন। সেই ছবি কিনেছেন চিটফান্ড সংস্থার মালিকরা। ফলে দুর্নীতির সূত্রপাত তখন থেকেই হয়েছিল বলে মনে হয়।"
একদিকে যখন সোমবারেই 'ইন্ডিয়া' জোট বৈঠকে বসছে। দিল্লীতে রয়েছেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেদিনই তৃণমূলের একাধিক সাংসদ চিঠি দিতে পারেন অভিষেকে অনাস্থা এনে, এমন জল্পনা ছিলই। তবে কতজন আর তাঁরা কে কে? তা নিয়ে নিশ্চিত তথ্য জানা যায়নি। এরই মাঝে এদিন সুখেন্দু শেখরের পদ ও দল থেকে ইস্তফা, তৃণমূলের আরও বড় ভাঙনের বার্তা দিল, এমনই মত বিভিন্ন মহলের।

No comments:
Post a Comment