মমতার একদিন আগেই দিল্লীতে অভিষেক, দল বাঁচতে কোন কৌশল নিচ্ছেন তৃণমূল সুপ্রিমো? - Press Card News

Breaking

Post Top Ad

Post Top Ad

Sunday, June 7, 2026

মমতার একদিন আগেই দিল্লীতে অভিষেক, দল বাঁচতে কোন কৌশল নিচ্ছেন তৃণমূল সুপ্রিমো?


কলকাতা: বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের শোচনীয় পরাজয়ের পরেই বড় ধরণের বিদ্রোহ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ছাড়াই বৈঠকে পরিষদীয় দলের নেতা বেছে নেওয়া হয় ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে এবং তিনি বিরোধী দলনেতার চেয়ারে বসে। ৫৮ জনের সমর্থন নিয়ে বিরোধী দলনেতা হয়েছেন ঋতব্রত। ফলত বিধানসভার রাশ মমতার হাত থেকে ফস্কে গিয়েছে। এরপরেই গুঞ্জন তীব্র হয়েছে, সংসদীয় দলেও এই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে চলেছে। কারণ বিদ্রোহী বিধায়কদের পাশাপাশি একাধিক সাংসদকেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডাকা বৈঠকে সম্প্রতি উপস্থিত হতে দেখা যাচ্ছে না এবং বারাসাতে তৃণমূল সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার সহ অনেকেই বেসুরো হয়েছেন। আর এই বড়সড় রাজনৈতিক সংকটের মধ্যেই, তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় শনিবার হঠাৎ দিল্লী পাড়ি দিয়েছেন। এই নিয়ে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।


এর আগে জানা গিয়েছিল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গেই দিল্লী যাবেন অভিষেক। কিন্তু সূত্র অনুযায়ী, তৃণমূল সুপ্রিমো নিজেই তাঁর ভাইপোকে একদিন আগে দিল্লীতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে, অভিষেকের দিল্লীতে রবিবারের কার্যক্রম নিয়ে দলীয় নেতাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা রয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক তৃণমূল সাংসদ বলেন, "আমি জানি না অভিষেক কেন শনিবার দিল্লীতে যাচ্ছেন। আমি দিল্লী বা কলকাতা কোথাও নেই এবং কোনও বৈঠকের বিষয়েও আমি জানি না।"


অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিল্লী সফরের সময়টিকেও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে, কারণ বিধানসভায় সই কেলেঙ্কারি কাণ্ডে সোমবার তাঁর সিআইডি-র সামনে হাজিরা দেওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে অভিষেক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে ১৫ দিন সময় চেয়েছিলেন, কিন্তু তদন্তকারী সংস্থা তাঁকে ৮ জুনেই হাজিরার নির্দেশ দিয়ে দ্বিতীয়বার নোটিশ ধরিয়েছে। 


নির্বাচনে ভরাডুবির পর থেকেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে একের পর এক তৃণমূল বিধায়ক-সাংসদরা ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নেত্রী মানলেন অভিষেককে তাঁরা নেতা মানতে নারাজ। বহিষ্কার করলেও সেই ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কেই বিরোধী দলনেতা হিসেবে মেনে নিয়েছেন তৃণমূলের বিদ্রোহী বিধায়করা। আর বিরোধী দলের নেতা চেয়ারে বসেই ঋতব্রত স্পষ্ট করে দিয়েছেন অভিষেকের সঙ্গে এই পরিষদীয় দলের দূরদূরান্তের কোনও সম্পর্ক নেই। পাশাপাশি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাঁদের পরামর্শদাতা হিসেবে থাকার অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি। 


বিদ্রোহী তৃণমূল বিধায়ক তথা বিধানসভার নতুন উপনেতা সন্দীপন সাহা এই পুরো ঘটনাটি নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছেন। সন্দীপন সাহা দাবী করেছেন যে, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় যা ঘটেছিল, ঠিক একই ঘটনা নয়াদিল্লীতে সংসদীয় দলের মধ্যেও ঘটছে এবং এটি শুধুমাত্র অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বৈরাচারের কারণেই হচ্ছে।


হাজী নুরুল ইসলামের মৃত্যুর পর, লোকসভায় তৃণমূলের বর্তমানে মোট ২৮ জন সদস্য রয়েছেন। দলত্যাগ বিরোধী আইনের কঠোর বিধান অনুসারে, অযোগ্য ঘোষিত না হয়ে একটি পৃথক গোষ্ঠী দাবী করার জন্য যেকোনও বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সংসদীয় দলের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশের, অর্থাৎ ন্যূনতম ১৯ জন লোকসভা সাংসদের সমর্থনের প্রয়োজন হবে। এছাড়াও, রাজ্যসভায় দলটির ১৩ জন সাংসদ রয়েছেন।


এসবের মাঝেই জল্পনা তীব্র হয়েছে, লোকসভা ও রাজ্যসভার সাংসদদের নিয়ে বাংলার মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটানোর প্রস্তুতি হিসেবে দিল্লীতে বিদ্রোহী নেতারা শুক্রবার রাত থেকে সাংসদদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ জোরদার করেছেন। সংসদের উভয় কক্ষে সাংসদদের ঐক্যবদ্ধ করার জন্য বিদ্রোহী নেতাদের প্রচেষ্টা উল্লেখযোগ্যভাবে তীব্র হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের প্রবীণ ও অভিজ্ঞ রাজ্যসভা সাংসদ সুখেন্দু শেখর রায় সম্প্রতি প্রকাশ্যে এই বিপদের কথা উল্লেখ করে বলেছেন যে, তিনি এত অল্প সময়ে ৬০ জন বিধায়ককে দলের বিরুদ্ধে যেতে কখনও দেখেননি এবং লোকসভা ও রাজ্যসভাতেও একই ধরণের প্রতিক্রিয়া হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।


এদিকে, তৃণমূল কংগ্রেসের বর্ষীয়ান সাংসদ সৌগত রায় দলের সম্পূর্ণ ভাঙনের দাবী দ্ব্যর্থহীনভাবে নাকচ করে দিয়েছেন। সরাসরি ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) অভিযুক্ত করে তিনি বলেন যে, বিজেপি বিধানসভা নির্বাচনের মতোই লোকসভা ও রাজ্যসভা শাখায় তৎপরতা চালানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর চেয়েও বড় লড়াই লড়েছেন এবং তিনি শক্তিশালী প্রত্যাবর্তন করবেন।


মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ নেতারা বলছেন যে, বিদ্রোহের খবরকে অনেকাংশে অতিরঞ্জিত করা হয়েছে এবং বেশিরভাগ সাংসদই শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে আছেন। তবে বাস্তবতা হল, মাত্র এক সপ্তাহ আগের তুলনায় তৃণমূলের সংকট উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং সংসদীয় দলের ঐক্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে দলটি যে অগ্নিপরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছে, সেকথা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না একেবারেই। অন্তত এই এক মাসের ঘটনাক্রম সেটাই বলছে।

No comments:

Post a Comment

Post Top Ad