নিজস্ব সংবাদদাতা, পশ্চিম মেদিনীপুর: তৃণমূল কংগ্রেসে ভাঙনের জেরে এ বছর ২১ জুলাই শহিদ দিবস ঘিরে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তুঙ্গে। কারা করবে শহীদ স্মরণসভা, কোথায় হবে অনুষ্ঠান, তা নিয়ে চলছে জোর টানাপোড়েন। এই পরিস্থিতিতে ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাইয়ের শহিদ পরিবারের অবস্থান কী? সেই প্রশ্নের উত্তরে স্পষ্ট বার্তা মিলল পশ্চিম মেদিনীপুরের একমাত্র ২১ জুলাইয়ের শহীদ শেখ আব্দুল খালেকের পরিবার থেকে। শহীদের স্ত্রী কোহিনুরা বিবির কথায়, “তৃণমূল মানেই আমাদের কাছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। যতদিন বাঁচব, দিদির সঙ্গেই থাকব। দিদি ডাকলে অসুস্থ শরীর নিয়েও যাওয়ার চেষ্টা করব।”
১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই তৎকালীন যুব কংগ্রেসের ডাকা রাইটার্স বিল্ডিং অভিযানে গিয়ে শহীদ হয়েছিলেন কেশপুরের গরগজপোতা গ্রামের যুব কংগ্রেস কর্মী শেখ আব্দুল খালেক। সরকারি শহীদ তালিকায় তাঁর নাম ওঠে ‘মহম্মদ খালেক’ নামে। ১৩ জন শহীদের মধ্যে তিনি ছিলেন পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার একমাত্র শহীদ। সেই ঘটনার পর থেকে করোনা অতিমারীর একটি বছর বাদ দিলে প্রতি বছরই কলকাতায় ২১ জুলাইয়ের শহীদ স্মরণসভায় উপস্থিত থেকেছেন তাঁর স্ত্রী কোহিনুরা বিবি।
এবার বয়সের ভার, অসুস্থতা এবং রাজনৈতিক বিভাজন- সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ভিন্ন। তবুও তাঁর অবস্থান একেবারে স্পষ্ট। কোহিনুরা বলেন, “কে ঋতব্রত, আমরা জানি না। আমরা দিদিকেই চিনি। আমার স্বামীও সেদিন দিদির ডাকেই আন্দোলনে গিয়েছিলেন। তখন কংগ্রেস ছিল, পরে দিদি তৃণমূল করেছেন। এখন আসল-নকল তৃণমূলের কথা শুনছি, কিন্তু আমাদের কাছে তৃণমূল মানেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।”
তাঁর কথায়, “আমি নিজে যেতে না পারলেও ছেলে-মেয়েদের পাঠাব। আমাদের পরিবারের কেউ না কেউ দিদির ডাকে অবশ্যই যাবে।” বয়স সত্তর পেরিয়েছে। হাঁটাচলায় কষ্ট হয়। তবুও কাঁপা গলায় তাঁর মন্তব্য, “যতদিন বাঁচব, ততদিন দিদির সঙ্গেই থাকব।”
১৯৯৩ সালের সেই আন্দোলনের স্মৃতিও এখনও তাজা কোহিনুরার মনে। সচিত্র ভোটার পরিচয়পত্র চালুর দাবীতে যুব কংগ্রেসের মহাকরণ অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন তাঁর স্বামী। সেদিন পুলিশের লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস ও গুলিচালনার পর দু'দিন নিখোঁজ ছিলেন খালেক। পরে রাস্তার ধারে গুরুতর জখম অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করা হলেও হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়।
কোহিনুরার কথায় উঠে আসে দীর্ঘ তিন দশকের সম্পর্কের স্মৃতিও। তিনি বলেন, “দিদি মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরও আমাদের ভুলে যাননি। প্রতি বছর শহীদ পরিবারকে চিঠি পাঠিয়েছেন, সম্মান জানিয়েছেন। ২১ জুলাইয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করার জন্য সারা বছর অপেক্ষা করে থাকতাম।”
শুধু আবেগ নয়, কৃতজ্ঞতার কথাও জানালেন তিনি। তাঁর দাবী, “দিদি রেলমন্ত্রী থাকাকালীন আমার ছেলেকে রেলে চাকরি দিয়েছিলেন। আমরা তাঁর দয়ায় বেঁচে আছি। তাঁকে ভুলব কীভাবে!”
এদিকে বিধানসভা নির্বাচনের পর তৃণমূলের দুই শিবিরই পৃথকভাবে ২১ জুলাই পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে ধর্মতলায় ঐতিহ্যবাহী সভাস্থলে অনুমতি দেওয়া হবে না বলে ইতিমধ্যেই জানিয়েছে রাজ্য সরকার। এই আবহে শহীদ পরিবারের বক্তব্য নতুন তাৎপর্য তৈরি করেছে।
কেশপুরের প্রবীণ তৃণমূল নেতা চিত্ত গরাইও স্মৃতিচারণ করে বলেন, “খালেক আমাদের সঙ্গেই ধর্মতলায় গিয়েছিল। দিদির ডাকে সাড়া দিয়েই সে শহীদ হয়েছিল। আমরা ওঁর পরিবারের পাশে ছিলাম, আছি, ভবিষ্যতেও থাকব।”
ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনের পর রাজনীতির সমীকরণ বদলেছে, দল ভেঙেছে, নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কিন্তু কেশপুরের শহীদ পরিবারের কাছে ২১ জুলাই এখনও শুধুই আত্মত্যাগের স্মৃতি আর সেই স্মৃতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, এটাই স্পষ্ট করে দিলেন শহীদ-পত্নী কোহিনুরা বিবি।

No comments:
Post a Comment