নিজস্ব প্রতিবেদন: লিভার মানবদেহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। খাবার হজমে সহায়তা করা, শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ বের করে দেওয়া, পুষ্টি সংরক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় প্রোটিন তৈরি—এসব গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে লিভার। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে লিভারের ক্ষতি হতে থাকলে ধীরে ধীরে সুস্থ কোষের জায়গায় শক্ত আঁশযুক্ত টিস্যু তৈরি হয়। এই অবস্থাকেই চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় লিভার সিরোসিস বলা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, লিভার সিরোসিস একটি দীর্ঘমেয়াদি এবং গুরুতর রোগ। সময়মতো চিকিৎসা না হলে এটি লিভার বিকল হওয়া, অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ, এমনকি লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দিতে পারে। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসার মাধ্যমে এর অগ্রগতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
লিভার সিরোসিস কী?
লিভার দীর্ঘদিন ধরে ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকলে সেখানে স্থায়ী দাগ বা আঁশযুক্ত টিস্যু তৈরি হয়। ফলে লিভার স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারে না। একবার এই দাগ তৈরি হয়ে গেলে তা সাধারণত সম্পূর্ণ আগের অবস্থায় ফিরে আসে না। তাই রোগটি যত দ্রুত ধরা পড়বে, তত বেশি ক্ষতি রোধ করা সম্ভব।
লিভার সিরোসিসের প্রধান কারণ
লিভার সিরোসিসের পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
দীর্ঘদিন অতিরিক্ত মদ্যপান
দীর্ঘস্থায়ী হেপাটাইটিস বি বা হেপাটাইটিস সি সংক্রমণ
চর্বিযুক্ত লিভার বা ফ্যাটি লিভার রোগ
অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস ও স্থূলতা
কিছু বংশগত রোগ
দীর্ঘদিন নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ বা বিষাক্ত রাসায়নিকের প্রভাব
বিরল কিছু অটোইমিউন রোগ
প্রাথমিক লক্ষণ
শুরুর দিকে অনেকেরই তেমন কোনো উপসর্গ থাকে না। তবে ধীরে ধীরে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিতে পারে—
সব সময় ক্লান্তি ও দুর্বল লাগা
ক্ষুধামন্দা
অকারণে ওজন কমে যাওয়া
বমি বমি ভাব
পেটের ডান পাশে অস্বস্তি বা ব্যথা
শরীরে চুলকানি
হাতের তালু লাল হয়ে যাওয়া
রোগ গুরুতর হলে যেসব লক্ষণ দেখা দেয়
রোগের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে আরও গুরুতর উপসর্গ দেখা দিতে পারে, যেমন—
চোখ ও ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া
পেটে পানি জমা
পা ফুলে যাওয়া
সহজেই রক্তপাত বা কালশিটে পড়া
রক্তবমি বা কালো পায়খানা
ঘুম ঘুম ভাব, স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া বা বিভ্রান্তি
তীব্র দুর্বলতা
কীভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়?
লিভার সিরোসিস নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসক রোগীর উপসর্গ, শারীরিক পরীক্ষা এবং বিভিন্ন পরীক্ষার পরামর্শ দিতে পারেন। এর মধ্যে রয়েছে—
রক্ত পরীক্ষা
আল্ট্রাসোনোগ্রাফি
ফাইব্রোস্ক্যান
সিটি স্ক্যান বা এমআরআই
প্রয়োজন হলে লিভার বায়োপসি
চিকিৎসা
লিভার সিরোসিসের চিকিৎসা নির্ভর করে রোগের কারণ ও পর্যায়ের ওপর। চিকিৎসার মূল উদ্দেশ্য হলো রোগের অগ্রগতি ধীর করা এবং জটিলতা কমানো।
চিকিৎসার অংশ হিসেবে থাকতে পারে—
রোগের মূল কারণের চিকিৎসা
সম্পূর্ণভাবে মদ্যপান বন্ধ করা
প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ সেবন
লবণ নিয়ন্ত্রিত খাদ্য গ্রহণ
নিয়মিত চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে থাকা
গুরুতর অবস্থায় লিভার প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হতে পারে
কীভাবে ঝুঁকি কমাবেন?
লিভার সুস্থ রাখতে কয়েকটি অভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ—
মদ্যপান থেকে বিরত থাকুন
স্বাস্থ্যকর ও সুষম খাদ্য গ্রহণ করুন
নিয়মিত ব্যায়াম করুন
ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন
হেপাটাইটিস বি-এর টিকা নিন
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবন করবেন না
ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান
কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
যদি চোখ বা ত্বক হলুদ হয়ে যায়, পেট অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যায়, রক্তবমি হয়, কালো পায়খানা হয়, অথবা বিভ্রান্তি ও অচেতনতার মতো লক্ষণ দেখা দেয়, তাহলে দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালে বা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
লিভার সিরোসিস এমন একটি রোগ, যা অনেক সময় দীর্ঘদিন নীরবে শরীরের ক্ষতি করে। তাই দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি, ক্ষুধামন্দা, পেট ফোলা বা জন্ডিসের মতো লক্ষণকে অবহেলা করা উচিত নয়। সময়মতো রোগ নির্ণয়, সঠিক চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই এই রোগের জটিলতা কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

No comments:
Post a Comment