যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাতের পর গভীর শোকের আবহে থমকে রয়েছে ইরান। দেশটির সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেইকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে তেহরানে নেমেছে হাজার হাজার মানুষ। কালো কাপড়ে মোড়া কফিন, বিলাপরত সমর্থক, মাথা চাপড়ে কান্নায় ভেঙে পড়া জনতা এবং "প্রতিশোধ"–এর স্লোগানে রাজধানীর পরিবেশ হয়ে উঠেছে আবেগঘন ও উত্তেজনাপূর্ণ।
শুক্রবার তেহরানের একটি বৃহৎ প্রার্থনা কক্ষে খামেনেইর মরদেহ সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য রাখা হয়। কফিনের ওপর কালো পাগড়ি ও ফুল দিয়ে সাজানো হয়, যা শিয়া ধর্মীয় নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। সকাল থেকেই হাজার হাজার মানুষ সেখানে ভিড় জমান। অনেকে কফিন স্পর্শ করে কান্নায় ভেঙে পড়েন, কেউ ফুল অর্পণ করেন, আবার কেউ ধর্মীয় শোকানুষ্ঠানের অংশ হিসেবে বুক চাপড়ে ও মাথায় আঘাত করে শোক প্রকাশ করেন।
ইরানের সরকারি সূত্রের দাবি, ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধের প্রথম দফার বিমান হামলায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেই তাঁর পরিবারের আরও চার সদস্যের সঙ্গে নিহত হন। যুদ্ধের পরিস্থিতির কারণে নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি থাকায় ইসলামী রীতি অনুযায়ী তাৎক্ষণিক জানাজা ও দাফন করা সম্ভব হয়নি। পরে অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর শেষকৃত্যের আয়োজন করা হয়।
সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, সপ্তাহব্যাপী শোকানুষ্ঠানের অংশ হিসেবে খামেনেইর মরদেহ তেহরান থেকে কোম, এরপর ইরাকের পবিত্র শহর নজফ ও কারবালায় নিয়ে যাওয়া হবে। সবশেষে বৃহস্পতিবার মাশহাদে তাঁকে দাফন করা হবে। এই সফরের উদ্দেশ্য দেশের পাশাপাশি শিয়া মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষকে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ করে দেওয়া।
শোকানুষ্ঠানে ইরানের বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামরিক ও ধর্মীয় নেতাদের পাশাপাশি বিদেশি প্রতিনিধিদেরও উপস্থিত থাকার কথা জানানো হয়েছে। রাজধানী তেহরানে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে অতিরিক্ত সেনা ও নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেই দীর্ঘ ৩৭ বছর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর সময়ে ইরানের পররাষ্ট্রনীতি, পারমাণবিক কর্মসূচি এবং পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছিল। তাঁর মৃত্যুর পর দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
এদিকে শোকানুষ্ঠানে অংশ নেওয়া বহু সমর্থক যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। বিভিন্ন স্থানে প্রতিশোধমূলক স্লোগান শোনা গেছে এবং জাতীয় ঐক্য বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন ইরানের শীর্ষ নেতারা। তবে সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি জনগণকে শান্ত থাকার আহ্বানও জানিয়েছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, খামেনেইর মৃত্যু শুধু ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, গোটা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। নতুন নেতৃত্বের অধীনে ইরানের পররাষ্ট্রনীতি, আঞ্চলিক কৌশল এবং পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক কোন পথে এগোবে, সেদিকেই এখন নজর আন্তর্জাতিক মহলের।

No comments:
Post a Comment