জিআই স্বীকৃতিতে বিশ্বমঞ্চে কৃষ্ণনগরের মাটির পুতুল, সুরক্ষিত হল বাংলার শতাব্দীপ্রাচীন শিল্পঐতিহ্য - Press Card News

Breaking

Post Top Ad

Post Top Ad

Sunday, July 5, 2026

জিআই স্বীকৃতিতে বিশ্বমঞ্চে কৃষ্ণনগরের মাটির পুতুল, সুরক্ষিত হল বাংলার শতাব্দীপ্রাচীন শিল্পঐতিহ্য


 বাংলার ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্পের ইতিহাসে আরও একটি গর্বের অধ্যায় যুক্ত হল। নদিয়ার কৃষ্ণনগরের বিখ্যাত মাটির পুতুল আনুষ্ঠানিকভাবে ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই (জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন) স্বীকৃতি অর্জন করেছে। দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার পর পাওয়া এই স্বীকৃতি শুধু একটি শিল্পের মর্যাদাই বাড়াল না, বরং কৃষ্ণনগরের শতাব্দীপ্রাচীন মৃৎশিল্পকে আইনি সুরক্ষার আওতায় নিয়ে এল। শিল্পী, গবেষক এবং সংস্কৃতিপ্রেমীদের মতে, এই স্বীকৃতি ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারে কৃষ্ণনগরের মাটির পুতুলের পরিচিতি ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনাকে আরও শক্তিশালী করবে।

নদিয়ার কৃষ্ণনগর শহরের ঘূর্ণি অঞ্চল বহু প্রজন্ম ধরে বাস্তবধর্মী মাটির পুতুল তৈরির জন্য বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জন করেছে। এখানকার শিল্পীরা শুধুমাত্র মাটি ব্যবহার করে এমন নিখুঁত ভাস্কর্য নির্মাণ করেন, যা প্রথম দেখায় অনেক সময় বাস্তব মানুষের মূর্তি বলে মনে হয়। মুখের সূক্ষ্ম অভিব্যক্তি, পোশাকের ভাঁজ, চোখের দৃষ্টি, শরীরের ভঙ্গিমা এবং ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অলঙ্কারের নিখুঁত উপস্থাপনাই কৃষ্ণনগরের মাটির পুতুলকে অন্য সব মৃৎশিল্প থেকে আলাদা করেছে।

ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায়, অষ্টাদশ শতকে নদিয়ার মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের আমলে এই শিল্পের বিশেষ বিকাশ ঘটে। রাজদরবারের পৃষ্ঠপোষকতায় দক্ষ মৃৎশিল্পীরা কৃষ্ণনগরে বসতি স্থাপন করেন এবং ধীরে ধীরে ঘূর্ণি এলাকা বাংলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মৃৎশিল্প কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ আমলেও এই শিল্প আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে স্থান পায় এবং ইউরোপের শিল্পসংগ্রাহকদের কাছেও সমাদৃত হয়। আজও সেই ঐতিহ্য সমান দক্ষতার সঙ্গে বহন করে চলেছেন ঘূর্ণির শিল্পীরা।

কৃষ্ণনগরের মাটির পুতুলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল এর বাস্তবধর্মী উপস্থাপনা। পৌরাণিক চরিত্র, লোকজ সংস্কৃতি, কৃষকের জীবন, বাউল, সাঁওতাল সম্প্রদায়ের জীবনযাপন, স্বাধীনতা সংগ্রামী, ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব, সামাজিক ঘটনা কিংবা সমকালীন জীবনের নানা দৃশ্য অত্যন্ত জীবন্তভাবে ফুটিয়ে তোলা হয় এই শিল্পে। অনেক শিল্পী নির্দিষ্ট ব্যক্তির ছবি দেখে অবিকল প্রতিকৃতিও তৈরি করেন, যা তাঁদের অসাধারণ দক্ষতার প্রমাণ।

জিআই বা ভৌগোলিক নির্দেশক স্বীকৃতি এমন একটি আইনগত স্বীকৃতি, যা কোনও নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলের বিশেষ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন পণ্যের পরিচয় সংরক্ষণ করে। এই স্বীকৃতি পাওয়ার ফলে কৃষ্ণনগরের বাইরে তৈরি কোনও পণ্য আর "কৃষ্ণনগরের মাটির পুতুল" নামে বাজারজাত করা যাবে না। ফলে নকল পণ্যের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে এবং প্রকৃত শিল্পীদের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকবে।

জিআই নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছিল ঘূর্ণি ক্লে ডল অ্যান্ড টেরাকোটা আর্টিজানস ক্লাস্টার কো-অপারেটিভ ইন্ডাস্ট্রিয়াল সোসাইটি লিমিটেড। কয়েক বছরের পর্যালোচনার পর অবশেষে এই শিল্প আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি লাভ করে। শিল্পীদের মতে, এটি শুধু একটি প্রশাসনিক সাফল্য নয়, বরং কয়েক প্রজন্ম ধরে চলে আসা শিল্পচর্চার প্রতি জাতীয় স্বীকৃতি।

ঘূর্ণির রাষ্ট্রপতি পুরস্কারপ্রাপ্ত মৃৎশিল্পী সুবীর পাল এই স্বীকৃতিকে ঐতিহাসিক মুহূর্ত বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন জায়গায় তৈরি নিম্নমানের পুতুল কৃষ্ণনগরের নাম ব্যবহার করে বিক্রি হওয়ায় প্রকৃত শিল্পীরা ক্ষতির মুখে পড়ছিলেন। এখন জিআই স্বীকৃতির ফলে সেই সমস্যা অনেকটাই কমবে। পাশাপাশি দেশ-বিদেশের ক্রেতাদের কাছেও আসল কৃষ্ণনগরের পুতুলের পরিচয় আরও স্পষ্ট হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জিআই স্বীকৃতি শুধু ঐতিহ্য সংরক্ষণ করে না, স্থানীয় অর্থনীতিকেও নতুন গতি দেয়। এই স্বীকৃতির ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির সুযোগ বাড়বে, পর্যটকদের আগ্রহ বৃদ্ধি পাবে এবং ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের সঙ্গে যুক্ত বহু পরিবারের আয় বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হবে। বর্তমানে ঘূর্ণির বহু পরিবার সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। তাঁদের কাছে এই স্বীকৃতি নতুন আশার বার্তা।

তবে শিল্পীদের একাংশের দাবি, শুধুমাত্র জিআই স্বীকৃতি পেলেই সব সমস্যার সমাধান হবে না। নিয়মিত সরকারি সহায়তা, সহজ ঋণ, কাঁচামালের পর্যাপ্ত সরবরাহ, আধুনিক বিপণন ব্যবস্থা, অনলাইন বাজারে প্রবেশের সুযোগ এবং নতুন প্রজন্মকে এই শিল্পে উৎসাহিত করার উদ্যোগও সমানভাবে জরুরি। তা না হলে ভবিষ্যতে দক্ষ শিল্পীর সংখ্যা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।

বাংলার হস্তশিল্পের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের অন্যতম উজ্জ্বল নিদর্শন কৃষ্ণনগরের মাটির পুতুল। জিআই স্বীকৃতির মাধ্যমে এই শিল্প আজ নতুন পরিচয়, নতুন মর্যাদা এবং আইনি সুরক্ষা পেল। শিল্পীদের আশা, এই স্বীকৃতি আগামী দিনে বিশ্ববাজারে কৃষ্ণনগরের মাটির পুতুলকে আরও জনপ্রিয় করে তুলবে এবং বাংলার এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে আগামী প্রজন্মের কাছে আরও শক্তিশালীভাবে পৌঁছে দেবে।

No comments:

Post a Comment

Post Top Ad