তৃণমূল কংগ্রেসের প্রভাবশালী নেতা এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত দেবরাজ চক্রবর্তীকে ঘিরে তদন্তে নতুন গতি এসেছে। বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেট তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা একাধিক অভিযোগের তদন্তে বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করেছে। পুলিশের দাবি, কেবল একটি তোলাবাজির অভিযোগ নয়, আরও একাধিক গুরুতর অভিযোগের সূত্র ধরে এখন বিস্তৃত তদন্ত চালানো হচ্ছে।
পুলিশ সূত্রের খবর, একজন উপ-পুলিশ কমিশনার পদমর্যাদার আধিকারিকের নেতৃত্বে আট সদস্যের একটি বিশেষ দল তদন্তের দায়িত্ব নিয়েছে। অভিযোগকারীদের বক্তব্য, নথিপত্র, আর্থিক লেনদেনের তথ্য এবং সম্পত্তি সংক্রান্ত কাগজপত্র খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তকারীদের মতে, অভিযোগগুলির মধ্যে কোনও সুসংগঠিত চক্র কাজ করেছে কি না, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
একাধিক মামলার তদন্ত একসঙ্গে
দেবরাজ চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে মোট দশটি অভিযোগ জমা পড়েছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে আটটি অভিযোগের ভিত্তিতে পৃথক মামলা রুজু করে তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। প্রতিটি মামলার অভিযোগ আলাদা হলেও তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, এই ঘটনাগুলির মধ্যে কোনও যোগসূত্র রয়েছে কি না।
পুলিশের দাবি, প্রাথমিক তদন্তে বেশ কয়েকজন প্রাক্তন জনপ্রতিনিধি, ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং বিভিন্ন স্তরের ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে। সেই কারণেই পর্যায়ক্রমে তাঁদের ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
প্রাক্তন কাউন্সিলরদের তলব
বিশেষ তদন্তকারী দল সম্প্রতি সাতজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নোটিস পাঠিয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বিধাননগর পুরনিগমের ছয়জন প্রাক্তন কাউন্সিলর এবং দেবরাজ চক্রবর্তীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত একজন ব্যক্তি।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, প্রথম দফায় ডাকা হলেও অধিকাংশ প্রাক্তন কাউন্সিলর উপস্থিত হননি। তাঁরা অনুপস্থিত থাকার কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজনে তাঁদের আবারও নোটিস পাঠানো হতে পারে।
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের বক্তব্য, অভিযোগপত্র, সাক্ষীদের বয়ান অথবা আর্থিক নথিতে যাঁদের নাম উঠে আসবে, তাঁদের প্রত্যেককেই আইনি প্রক্রিয়া মেনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তদন্তের প্রয়োজনে আরও বহু ব্যক্তিকে তলব করা হতে পারে।
পুরনো মামলার সঙ্গেও মিল খুঁজছে পুলিশ
এর আগে তোলাবাজির একটি মামলায় কয়েকজন প্রাক্তন কাউন্সিলরকে গ্রেফতার করা হলেও পরে তাঁরা আদালত থেকে জামিন পান। এবার নতুন করে তদন্তের পরিধি বাড়ায় তাঁদেরও আবার জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হতে পারে বলে পুলিশ সূত্রে ইঙ্গিত মিলেছে।
তদন্তকারীরা পুরনো মামলার নথি, সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং নতুন অভিযোগের মধ্যে কোনও মিল রয়েছে কি না, তা যাচাই করছেন। একইসঙ্গে মোবাইল ফোনের তথ্য, আর্থিক লেনদেনের নথি এবং বিভিন্ন দপ্তরের নথিও পরীক্ষা করা হচ্ছে।
সম্পত্তির উৎস খতিয়ে দেখছে তদন্তকারী সংস্থাগুলি
দেবরাজ চক্রবর্তী ও তাঁর স্ত্রীর নামে বা তাঁদের ঘনিষ্ঠদের নামে বিপুল সম্পত্তি রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। গত কয়েক বছরে রাজারহাট, নিউটাউন-সহ বিভিন্ন এলাকায় একাধিক জমি, ফ্ল্যাট, বাণিজ্যিক সম্পত্তি এবং অন্যান্য বিনিয়োগের তথ্য তদন্তকারীদের নজরে এসেছে বলে জানা যাচ্ছে।
এই সম্পত্তিগুলির অর্থের উৎস কী, আয়ের সঙ্গে তার সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, সমস্ত নথি এখন খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজনে আয়কর সংক্রান্ত তথ্য, ব্যাংক হিসাব এবং কোম্পানির আর্থিক নথিও সংগ্রহ করা হতে পারে।
অর্থ পাচারের অভিযোগেও বাড়ছে নজর
তদন্তে একটি বেসরকারি সংস্থার আর্থিক লেনদেন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ, ওই সংস্থার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিভিন্ন জায়গায় স্থানান্তর করা হয়েছে। যদিও এই অভিযোগ এখনও তদন্তাধীন এবং আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
পুলিশের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাও আর্থিক লেনদেনের উৎস, ব্যাংক হিসাব, সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয় এবং সম্ভাব্য অর্থ পাচারের দিকগুলি খতিয়ে দেখছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে।
বিরোধীদের অভিযোগ
বিরোধী শিবিরের অভিযোগ, দেবরাজ চক্রবর্তীর নামে ও বেনামে বিপুল মূল্যের সম্পত্তি রয়েছে, যার পরিমাণ প্রায় তেরোশো কোটি টাকা হতে পারে। পাশাপাশি নির্বাচনী হলফনামায় সম্পত্তি সংক্রান্ত তথ্য গোপন বা ভুলভাবে উল্লেখ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
তবে এই অভিযোগগুলির সত্যতা এখনও আদালতে প্রমাণিত হয়নি। তদন্তকারী সংস্থাগুলি সমস্ত নথি যাচাই করার পরই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছবে।
এখনও তদন্ত চলছে
এই মুহূর্তে গোটা ঘটনাটি তদন্তাধীন। তদন্তকারী সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহের পর প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে আইনত দোষী বলা যায় না।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এই তদন্ত আগামী দিনে আরও বিস্তৃত হতে পারে। নতুন নথি, আর্থিক তথ্য কিংবা সাক্ষ্য সামনে এলে আরও ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হতে পারে। ফলে দেবরাজ চক্রবর্তীকে ঘিরে এই মামলার দিকে এখন রাজ্যের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলের নজর রয়েছে।

No comments:
Post a Comment