দক্ষিণ দমদম এবং বিধাননগর পুর এলাকার একাধিক বেআইনি নির্মাণ, সরকারি সম্পত্তির ব্যবহার এবং আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া বিধাননগরের প্রাক্তন তৃণমূল কাউন্সিলর দেবরাজ চক্রবর্তীকে কেন্দ্র করে তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই নতুন নতুন অভিযোগ সামনে আসছে। বিরোধীদের দাবি, বহু বছর ধরে বেআইনি নির্মাণ, সরকারি সম্পত্তির অপব্যবহার এবং পুরসভার রাজস্ব আদায়ে ব্যাপক অনিয়ম চলেছে। অন্যদিকে, অভিযুক্তদের একাংশ সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, দক্ষিণ দমদম পুরসভার বিভিন্ন এলাকায় বেআইনি নির্মাণকে বৈধ দেখানোর জন্য পুরনো তারিখ ব্যবহার করে নথিতে অনুমোদনের অভিযোগ উঠেছে। দাবি করা হচ্ছে, বাস্তবে পরে তৈরি হওয়া একাধিক ভবনকে পুরনো নির্মাণ হিসেবে দেখিয়ে প্রয়োজনীয় অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। এই অভিযোগের সত্যতা খতিয়ে দেখতে তদন্তকারী সংস্থাগুলি নথিপত্র পরীক্ষা করছে।
সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলির একটি দক্ষিণ দমদমের আঠারো নম্বর ওয়ার্ডকে ঘিরে। অভিযোগ, স্থানীয় এক দাতার দেওয়া জমিতে শিশুদের জন্য একটি বিদ্যালয় গড়ে উঠেছিল। পরে সেই বিদ্যালয় বন্ধ করে সেখানে ব্যাডমিন্টন প্রশিক্ষণকেন্দ্র তৈরি করা হয়। পাশাপাশি একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের উপরের অংশে টেনিস প্রশিক্ষণকেন্দ্র গড়ে তোলার অভিযোগও সামনে এসেছে। বিরোধীদের দাবি, এই সমস্ত কেন্দ্র থেকে প্রাপ্ত ভাড়ার অর্থ পুরসভার কোষাগারে জমা না পড়ে ব্যক্তিগতভাবে আত্মসাৎ করা হয়েছে।
রাজারহাট-গোপালপুরের বিজেপি বিধায়ক তরুণজ্যোতি তিওয়ারি অভিযোগ করেছেন, শুধু ক্রীড়াকেন্দ্র নয়, পুরসভার অধীন একাধিক অনুষ্ঠান ভবনের ভাড়ার অর্থও নিয়মমাফিক সরকারি তহবিলে জমা হয়নি। তাঁর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী এই অর্থ সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছিল। তবে এই অভিযোগগুলিরও এখনও সরকারি তদন্ত সম্পূর্ণ হয়নি।
বিতর্ক এখানেই থেমে নেই। তরুণজ্যোতি তিওয়ারি অভিযোগ করেছেন, রাজারহাট-গোপালপুর পুরসভা বিধাননগর পুরনিগমের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পরেও পুরনো তারিখ ব্যবহার করে একাধিক নির্মাণ পরিকল্পনায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। তাঁর অভিযোগ, নতুন নির্মাণকে পুরনো প্রকল্প হিসেবে দেখিয়ে নিয়ম এড়ানোর চেষ্টা করা হয়। তবে এই অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন প্রাক্তন পুরপ্রধান তাপস চট্টোপাধ্যায়। তাঁর বক্তব্য, পুরসভা বিধাননগরের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর নির্মাণ অনুমোদনের সঙ্গে তাঁর কোনও প্রশাসনিক সম্পর্ক ছিল না।
এদিকে দেবরাজ চক্রবর্তীকে ঘিরে তদন্তের পরিধিও ক্রমশ বাড়ছে। তদন্তকারী সংস্থাগুলি তাঁর আর্থিক লেনদেন, ব্যাংক হিসাব, সম্পত্তি এবং বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সম্ভাব্য যোগসূত্র খতিয়ে দেখছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচনের পর তাঁর একাধিক ব্যাংক হিসাব থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ উত্তোলনের বিষয়েও তদন্ত চলছে। পাশাপাশি তোলাবাজি, জমি দখল এবং বেআইনি আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত অভিযোগও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
বর্তমানে এই সমস্ত অভিযোগের তদন্ত চলছে। এখনও পর্যন্ত কোনও আদালত বা তদন্তকারী সংস্থা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত বলে ঘোষণা করেনি। ফলে অভিযোগগুলির চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণ হবে তদন্ত এবং আইনি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হওয়ার পর। তবে একের পর এক অভিযোগ প্রকাশ্যে আসায় দক্ষিণ দমদম, রাজারহাট এবং বিধাননগর এলাকার পুর প্রশাসনকে ঘিরে রাজনৈতিক চাপানউতোর আরও তীব্র হয়েছে।

No comments:
Post a Comment