আজ ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী। এই উপলক্ষে তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়ে বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। দেশের ঐক্য, অখণ্ডতা ও আত্মমর্যাদা রক্ষায় তাঁর অবদান এবং আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। একইসঙ্গে পশ্চিমবঙ্গে একাধিক কর্মসূচিতে যোগ দিতে কলকাতায় এসেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। দিনভর বিভিন্ন স্মরণসভা, মাল্যদান ও সাংগঠনিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে ভারতীয় জনতা পার্টি।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর সামাজিক মাধ্যমের বার্তায় বলেন, ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের আত্মত্যাগ ভারতের প্রতিটি প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে। তিনি আরও বলেন, দেশের জন্য যাঁরা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেন, তাঁদের আদর্শ কখনও বিলীন হয় না। তাঁদের চিন্তা, কর্ম ও মূল্যবোধ যুগের পর যুগ মানুষের পথপ্রদর্শক হয়ে থাকে।
পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীও শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ছিলেন দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ এবং দৃঢ় জাতীয়তাবাদী নেতা। দেশের ঐক্য, অখণ্ডতা ও জনসেবার প্রতি তাঁর নিষ্ঠা আজও কোটি মানুষের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস।
জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ কলকাতায় এসে প্রথমে ভবানীপুরে অবস্থিত ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের পৈতৃক বাসভবনে গিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর ইকো পার্কে তাঁর মূর্তির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের অনুষ্ঠানে অংশ নেন। পরে বিশ্ব বাংলা মেলা প্রাঙ্গণে আয়োজিত জন্মবার্ষিকী উদযাপন সভায় উপস্থিত থাকেন। অনুষ্ঠানে রাজ্য বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বও অংশ নেয়।
কে ছিলেন ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়?
ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ১৯০১ সালের ৬ জুলাই কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ছিলেন ভারতের অন্যতম প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিংবদন্তি উপাচার্য। ছোটবেলা থেকেই অসাধারণ মেধার পরিচয় দেওয়া শ্যামাপ্রসাদ আইনশাস্ত্রে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন এবং পরবর্তীকালে শিক্ষা ও জনজীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
মাত্র ৩৩ বছর বয়সে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হন। সে সময় এত অল্প বয়সে এই দায়িত্ব গ্রহণ ছিল এক ঐতিহাসিক ঘটনা। তাঁর উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা ও গবেষণার বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার আনা হয়।
রাজনৈতিক জীবন
ড. শ্যামাপ্রসাদ প্রথমে বাংলার আইনসভায় নির্বাচিত হন। স্বাধীনতার পর তিনি দেশের প্রথম কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় শিল্প ও সরবরাহ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে নীতিগত মতপার্থক্যের কারণে তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন।
১৯৫১ সালে তিনি ভারতীয় জনসংঘ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং দলের প্রথম সভাপতি হন। পরবর্তীকালে এই জনসংঘই বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বর্তমান ভারতীয় জনতা পার্টির পূর্বসূরি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
জম্মু ও কাশ্মীর ইস্যুতে আন্দোলন
ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম আলোচিত অধ্যায় ছিল জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ সাংবিধানিক ব্যবস্থার বিরোধিতা। তাঁর বক্তব্য ছিল, একটি দেশের মধ্যে পৃথক সংবিধান, পৃথক পতাকা এবং পৃথক প্রশাসনিক ব্যবস্থার পরিবর্তে সমগ্র দেশে একই সাংবিধানিক কাঠামো থাকা উচিত।
১৯৫৩ সালে অনুমতিপত্র ছাড়াই জম্মু ও কাশ্মীরে প্রবেশ করলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। বন্দি অবস্থায় ২৩ জুন ১৯৫৩ সালে শ্রীনগরে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর কারণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বিতর্ক থাকলেও সরকারি নথি অনুযায়ী তিনি অসুস্থ হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
উত্তরাধিকার
ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে একদিকে যেমন একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ হিসেবে স্মরণ করা হয়, তেমনি স্বাধীন ভারতের রাজনীতিতেও তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। শিক্ষা, জাতীয় ঐক্য, সাংবিধানিক প্রশ্ন এবং রাষ্ট্রচিন্তা নিয়ে তাঁর মতাদর্শ আজও রাজনৈতিক আলোচনায় প্রাসঙ্গিক।
তাঁর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে দেশজুড়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে আলোচনা সভা, শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন ও স্মরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। তাঁর জীবন ও কর্ম নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরাই এসব কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য।

No comments:
Post a Comment