দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার বারুইপুরে এক নাবালিকার ধর্ষণ ও খুনের অভিযোগকে ঘিরে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিক্ষুব্ধ জনতার গণপিটুনিতে এক অভিযুক্তের মৃত্যু হয়েছে। একই সঙ্গে রাস্তায় বিক্ষোভ, রেল অবরোধ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং পুলিশ ক্যাম্পে হামলার অভিযোগে গোটা এলাকা কার্যত অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে।
এই ঘটনার পর নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি নাবালিকার বাবাকে সমবেদনা জানিয়ে আশ্বাস দেন, ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা হবে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি মঙ্গলবার পরিবারকে ভবানীভবনে গিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে দেখা করার অনুরোধ জানান। পরিবারের সব দাবি গুরুত্ব দিয়ে শোনা হবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, শনিবার বিকেল থেকে নিখোঁজ ছিল এগারো বছরের ওই নাবালিকা। পরিবারের সদস্যরা দীর্ঘ সময় খোঁজাখুঁজির পর থানায় অভিযোগ জানান। রবিবার সকালে এলাকার একটি পুকুর থেকে তার দেহ উদ্ধার হয়। দেহ উদ্ধারের পরই এলাকাজুড়ে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। পরিবারের অভিযোগ, নাবালিকাকে অপহরণের পর ধর্ষণ করে খুন করা হয়েছে।
প্রাথমিক তদন্তে পুলিশের অনুমান, শ্বাসরোধ করে নাবালিকাকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর মৃত্যুর সঠিক কারণ এবং যৌন নির্যাতনের বিষয়টি স্পষ্ট হবে বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন। ইতিমধ্যে একটি মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু হয়েছে।
ঘটনার পর ক্ষুব্ধ জনতা অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও কঠোর শাস্তির দাবিতে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ দেখান। কূলপি রোডে মৃতদেহ রেখে দীর্ঘক্ষণ অবরোধ চলে। পরে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অভিযোগ, বিক্ষোভ চলাকালীন জনতার হাতে ধরা পড়েন ইন্দ্রজিৎ তাঁতি নামে এক যুবক, যাকে স্থানীয়রা এই ঘটনায় জড়িত বলে সন্দেহ করেন। উত্তেজিত জনতা তাকে গণপিটুনি দেয়। গুরুতর আহত অবস্থায় পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, এই নৃশংস ঘটনার সঙ্গে চার থেকে পাঁচজন জড়িত থাকতে পারে। তাঁদের মধ্যে একজনকে ইতিমধ্যেই গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বাকি অভিযুক্তদের খোঁজে একাধিক জায়গায় তল্লাশি চলছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
বিক্ষোভের সময় পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। সূর্যপুর পুলিশ ক্যাম্পে হামলা এবং ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
ঘটনার প্রতিবাদে শিয়ালদহ দক্ষিণ শাখার নামখানা লাইনে রেল অবরোধও করেন বিক্ষোভকারীরা। কিছু সময়ের জন্য ট্রেন চলাচল ব্যাহত হয়। পরে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ এবং মুখ্যমন্ত্রীর আশ্বাসের পর ধীরে ধীরে অবরোধ উঠে যায়।
পুলিশের তরফে জানানো হয়েছে, এই ঘটনায় ধর্ষণ, খুন এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক ধারায় মামলা দায়ের করে তদন্ত চলছে। গণপিটুনিতে মৃত্যুর ঘটনাতেও পৃথক মামলা রুজু করা হয়েছে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এদিকে নাবালিকার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে এলাকায় এখনও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। যে কোনও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে পুলিশি টহল জোরদার করা হয়েছে। তদন্তকারীরা প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান সংগ্রহ, ঘটনাস্থল থেকে ফরেনসিক নমুনা সংগ্রহ, সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা এবং প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত চিত্র সামনে আনার চেষ্টা করছেন।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তদন্তের স্বার্থে কোনও তথ্য গোপন করা হবে না। ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন, ফরেনসিক পরীক্ষার ফল এবং অন্যান্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতেই পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে নির্যাতিতার পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছে রাজ্য সরকার।

No comments:
Post a Comment