রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পর গ্রামীণ প্রশাসনের একটি বড় অংশ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে বলে দাবি করল রাজ্যের পঞ্চায়েত দফতর। পঞ্চায়েত মন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, রাজ্যের প্রায় দুই হাজার পঞ্চায়েত প্রধান বর্তমানে নিয়মিত দফতরে উপস্থিত হচ্ছেন না। কেউ আত্মগোপন করে রয়েছেন, আবার কেউ দীর্ঘদিন ধরে সরকারি দায়িত্ব পালন থেকে বিরত আছেন। এর ফলে সাধারণ মানুষের প্রয়োজনীয় পরিষেবা ব্যাহত হচ্ছে এবং একাধিক উন্নয়নমূলক প্রকল্পের কাজ থমকে রয়েছে।
মন্ত্রী জানান, পঞ্চায়েত স্তরেই গ্রামের অধিকাংশ সরকারি পরিষেবার কাজ সম্পন্ন হয়। জন্ম ও মৃত্যু সংক্রান্ত নথি, জাতিগত শংসাপত্র, বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে আবেদন, রাস্তা, পানীয় জল, নিকাশি ব্যবস্থা, আবাসন প্রকল্প, একশো দিনের কাজসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবা পঞ্চায়েতের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। প্রধানদের অনুপস্থিতির কারণে এই সমস্ত কাজের গতি মারাত্মকভাবে কমে গিয়েছে। সাধারণ মানুষকে বারবার পঞ্চায়েত অফিসে গিয়ে খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে।
পঞ্চায়েত মন্ত্রীর অভিযোগ, অনেক প্রধান নিয়মিত বেতন ও ভাতা গ্রহণ করলেও দায়িত্ব পালনে অনীহা দেখাচ্ছেন। জনপ্রতিনিধি হিসেবে মানুষের ভোটে নির্বাচিত হওয়ার পর দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার কোনও সুযোগ নেই বলেও তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, যদি কেউ দায়িত্ব পালন করতে না চান, তাহলে সম্মানের সঙ্গে পদত্যাগ করে নতুন নেতৃত্বের পথ খুলে দেওয়া উচিত।
মন্ত্রী আরও বলেন, নতুন উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন, দরপত্র প্রক্রিয়া এবং পুরনো প্রকল্পের বিল পরিশোধ— সব ক্ষেত্রেই প্রশাসনিক জট তৈরি হয়েছে। ফলে গ্রামীণ সড়ক নির্মাণ, আবাসন প্রকল্প, পানীয় জল সরবরাহ, সেচ ব্যবস্থা এবং অন্যান্য জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির বাস্তবায়ন বাধার মুখে পড়ছে। দীর্ঘদিন এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে গ্রামের উন্নয়ন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
এদিকে সরকার পরিবর্তনের পর দুর্নীতির অভিযোগে একাধিক প্রাক্তন জনপ্রতিনিধিকে স্থানীয় বাসিন্দাদের বিক্ষোভের মুখে পড়তে হয়েছে। কোথাও কালো পতাকা, কোথাও বিক্ষোভ, আবার কোথাও ডিম ছোড়ার মতো ঘটনাও সামনে এসেছে। এই পরিস্থিতিতে অনেক জনপ্রতিনিধি এলাকায় যেতে বা পঞ্চায়েত অফিসে বসতে সাহস পাচ্ছেন না বলেই রাজনৈতিক মহলের একাংশের দাবি। যদিও সরকার মনে করছে, জনরোষের ভয়ে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার কোনও নৈতিক বা আইনি ভিত্তি নেই।
পলাতক বা নিষ্ক্রিয় প্রধানদের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, মানুষের ভোটে নির্বাচিত হওয়ার অর্থই হল মানুষের সামনে জবাবদিহি করা। কেউ যদি কাজ করতে অফিসে আসেন, তাহলে সাময়িকভাবে কিছু কটূক্তি বা প্রতিবাদের মুখে পড়তে হতে পারে। কিন্তু সেই কারণ দেখিয়ে মাসের পর মাস দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি আরও জানান, প্রথমে সরকার আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা মেটানোর চেষ্টা করবে। সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধিদের কাজে ফেরার আহ্বান জানানো হচ্ছে। কিন্তু এরপরও যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে দায়িত্ব পালন না করেন, তাহলে প্রশাসন কঠোর অবস্থান নেবে।
পঞ্চায়েত মন্ত্রীর হুঁশিয়ারি, প্রয়োজনে প্রশাসন ও পুলিশের সহায়তায় সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধিদের দফতরে নিয়ে এসে দায়িত্ব পালনের ব্যবস্থা করা হবে। সরকারি কাজ দীর্ঘদিন আটকে রাখার অভিযোগে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপও গ্রহণ করা হতে পারে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের স্বার্থ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও সরকার বিশেষ নজর রাখছে বলে তিনি জানান।
দুর্নীতি এবং দায়িত্বে অবহেলার বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে মন্ত্রী বলেন, জনগণের ধৈর্যেরও একটি সীমা রয়েছে। দীর্ঘদিন মানুষের কাজ বন্ধ থাকলে স্বাভাবিকভাবেই ক্ষোভ বাড়বে। তাই পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট সকলকে দায়িত্ব পালনে ফিরে আসার আহ্বান জানান তিনি।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পর প্রশাসনিক পুনর্গঠনের সময় পঞ্চায়েত স্তরে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত দূর করা সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ গ্রামের মানুষের কাছে সরকারি পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তরই হল পঞ্চায়েত ব্যবস্থা। ফলে এই সংকট দ্রুত কাটিয়ে স্বাভাবিক প্রশাসনিক কার্যক্রম ফিরিয়ে আনা এখন সরকারের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

No comments:
Post a Comment