ভারত ও প্রতিবেশী বাংলাদেশের মধ্যে চলমান সীমান্ত উত্তেজনা একটি নতুন ও গুরুতর মোড় নিয়েছে। ভারতে প্রবেশকারী অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে গৃহীত কঠোর আইনি পদক্ষেপে বাংলাদেশ গভীরভাবে ক্ষুব্ধ। উপরন্তু, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং এর সীমান্ত নিরাপত্তা ইউনিট, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), ভারত এবং ভারতীয় সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনীর (বিএসএফ) বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি গুরুতর ও আপত্তিকর অভিযোগ তুলেছে।
সাম্প্রতিক একটি আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন অনুসারে, বাংলাদেশ প্রশাসন দাবি করেছে যে, ভারত আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন ও দ্বিপাক্ষিক চুক্তি না মেনে রাতের অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের জোরপূর্বক সীমান্ত পার করে দিচ্ছে। বাংলাদেশে নবগঠিত তারিক রহমান সরকারের বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা এই বিষয়ে গভীর উদ্বেগ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
বিজিবির দাবি: রাতের অন্ধকারে আলো নিভিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে
ফিনানিক্যাল টাইমসের এক বিশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) কার্যক্রম নিয়ে গুরুতর অভিযোগ তুলেছে। বাংলাদেশের দাবি, বিএসএফ সদস্যরা অবৈধ বাংলাদেশি নাগরিক ও রোহিঙ্গা অভিবাসীদের সীমান্ত পার করে ফেরত পাঠানোর জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে অন্ধকারের অপেক্ষা করে। অভিযোগে বলা হয়েছে, বিএসএফ সীমান্তে ফ্লাডলাইট নিভিয়ে অভিবাসীদের আন্তর্জাতিক সীমান্ত পার করে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামা সিদ্দিকী অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ভারত সরকারের বর্তমান নীতির তীব্র সমালোচনা করেছেন। সিদ্দিকী বলেন, ভারত কোনো আনুষ্ঠানিক আইনি প্রক্রিয়া বা প্রত্যর্পণ চুক্তির বিধান ছাড়াই লোকজনকে ফেরত পাঠাচ্ছে। তার মতে, ভারতের এই তাড়াহুড়োর কারণে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের 'জিরো লাইনে' বিপুল সংখ্যক নিরীহ নারী ও শিশু আটকা পড়েছেন। এই সংবেদনশীল বিষয়ে বাংলাদেশের প্রতিমন্ত্রী শামা ওবাইদ ইসলামও একটি কড়া বিবৃতি দিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, ভারতের এই একতরফা পদক্ষেপ দুই দেশের মধ্যে আগে থেকেই ভঙ্গুর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও অবনতি ঘটাতে পারে।
বাংলাদেশের দাবি খণ্ডন করে কঠোর অবস্থান নিলেন ভারতীয় কর্মকর্তারা
বাংলাদেশের উত্থাপিত সমস্ত অভিযোগের বিষয়ে ভারতীয় কর্মকর্তারা অত্যন্ত দৃঢ় ও স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন। একজন ঊর্ধ্বতন ভারতীয় কূটনীতিক বিষয়টির বাস্তব চিত্র ব্যাখ্যা করে বলেন যে, নির্বাসন একটি কূটনৈতিক প্রক্রিয়া যার জন্য উভয় দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ সহযোগিতা প্রয়োজন, কিন্তু বাংলাদেশ এই গুরুতর বিষয়ে কখনোই ইতিবাচক সহযোগিতা করেনি।
ভারতীয় কর্মকর্তাদের মতে, অবৈধ অভিবাসীদের নাগরিকত্ব শনাক্তকরণ ও যাচাইয়ের জন্য ভারত বাংলাদেশ প্রশাসনের কাছে ২,৬৮০টিরও বেশি প্রমাণিত মামলা জমা দিয়েছিল। তবে, বাংলাদেশ সরকার এ বিষয়ে আর কোনো আইনি পদক্ষেপ নেয়নি। অনেক ক্ষেত্রে, এই যাচাইকরণ প্রক্রিয়াটি পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের দপ্তরগুলোতে ধুলো জমিয়ে পড়ে আছে।
ওই কর্মকর্তা আরও স্পষ্ট করেছেন যে, বাংলাদেশে শেখ হাসিনার সরকারের আমলে ভারতের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কারণে ভারত এই বিষয়ে কখনও কঠোর অবস্থান নেয়নি। তবে, বাংলাদেশে বড় ধরনের অভ্যুত্থান ও ক্ষমতার পরিবর্তনের পর, ভারত তার সীমান্তের নিরাপত্তা এবং অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে শূন্য-সহনশীলতার নীতি গ্রহণ করেছে।
পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের নির্বাচনী জয়ের পর পরিবর্তিত আবহ
সাম্প্রতিক পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) ভূমিধস বিজয়ের পর সীমান্ত এলাকার রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গেছে। গত মাসে এক সংবাদ সম্মেলনে পশ্চিমবঙ্গের নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, নতুন বিজেপি সরকার এ পর্যন্ত ১০,০০০-এরও বেশি অবৈধ অভিবাসীকে শনাক্ত করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়েছে। এছাড়াও, রাজ্যজুড়ে ১২টি ভিন্ন ভিন্ন আটক কেন্দ্রে প্রায় ১,৮০০ সন্দেহভাজন অভিবাসীকে নিরাপদ হেফাজতে রাখা হয়েছে এবং আইনি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলেই শীঘ্রই তাঁদের সীমান্ত পার করে দেশে ফেরত পাঠানো হবে। এদিকে, আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা তাঁর রাজ্য থেকে বেছে বেছে প্রত্যেক অবৈধ অভিবাসীকে ফেরত পাঠানোর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

No comments:
Post a Comment