৩০ বছর বয়স পার হওয়ার পর বেশিরভাগ মানুষ রক্তচাপ, রক্তে শর্করা বা হৃদ্যন্ত্রের স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতন হন। কিন্তু শরীরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ লিভারের কথা অনেকেই গুরুত্ব দেন না। অথচ লিভার শরীরের ৫০০টিরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে। তাই সুস্থ থাকতে হলে ৩০ বছর পেরোনোর পর থেকেই লিভারের যত্ন নেওয়া জরুরি।
লিভার শুধু খাবার হজমেই সাহায্য করে না। এটি শরীর থেকে ক্ষতিকর পদার্থ বের করে দেয়, কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ করে, বিভিন্ন ভিটামিন জমা রাখে এবং শরীরের শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। লিভারের একটি বিশেষ ক্ষমতা হলো, ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এটি নিজেকে অনেকটা পুনর্গঠন করতে পারে। তবে তার জন্য সময়মতো সঠিক যত্ন নেওয়া প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে ভারতে প্রতি তিনজন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে প্রায় একজন ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত। অনেকের ধারণা, শুধুমাত্র মদ্যপানকারীদেরই লিভারের সমস্যা হয়। কিন্তু বাস্তবে দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করা, অতিরিক্ত ওজন, ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল, মানসিক চাপ এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের কারণেও লিভারে চর্বি জমতে পারে।
চিকিৎসকদের সতর্কবার্তা, ফ্যাটি লিভারের চিকিৎসা না হলে তা ধীরে ধীরে লিভারে প্রদাহ, সিরোসিস এবং পরবর্তীতে লিভার ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ৩০ বছরের পর শরীরের বিপাকক্রিয়াও ধীরে ধীরে কমতে থাকে। তাই এই সময় থেকেই লিভারের প্রতি বাড়তি যত্ন নেওয়া উচিত।
লিভার সুস্থ রাখার কয়েকটি কার্যকর উপায়
প্রথমত, শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন। যাঁদের ফ্যাটি লিভার রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে মোট ওজনের মাত্র ৭ থেকে ১০ শতাংশ কমলেও উল্লেখযোগ্য উপকার পাওয়া যায়।
প্রতি সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট ব্যায়াম করুন। দ্রুত হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতার বা শক্তি বাড়ানোর ব্যায়াম—যে কোনও নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ লিভারের জন্য উপকারী।
খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনুন। অতিরিক্ত চিনি, প্রক্রিয়াজাত খাবার, পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট এবং তেলেভাজা খাবার কম খান। পরিবর্তে তাজা ফল, সবুজ শাকসবজি, গোটা শস্য, ডাল, বাদাম ও কম চর্বিযুক্ত প্রোটিন বেশি রাখুন। চিনি ও অতিরিক্ত দুধের সর ছাড়া ব্ল্যাক কফিও লিভারের জন্য উপকারী বলে মনে করা হয়।
মদ্যপান এড়িয়ে চলুন। বিশেষ করে যাঁদের ডায়াবেটিস, স্থূলতা, ফ্যাটি লিভার বা ভাইরাল হেপাটাইটিস রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে মদ্যপান লিভারের ক্ষতি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
হেপাটাইটিস বি ও সি সম্পর্কে সচেতন থাকুন। হেপাটাইটিস বি-এর টিকা নিরাপদ ও কার্যকর। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী টিকা ও পরীক্ষা করানো উচিত।
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্যথার ওষুধ বা তথাকথিত 'লিভার পরিষ্কার' করার ভেষজ পণ্য ব্যবহার করবেন না। এসব পণ্যের অনেকগুলির বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই এবং উল্টে লিভারের ক্ষতি করতে পারে।
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী লিভার ফাংশন টেস্ট করানো উচিত। যাঁদের ওজন বেশি, ডায়াবেটিস রয়েছে, মদ্যপানের অভ্যাস আছে বা পরিবারে লিভারের রোগের ইতিহাস রয়েছে, তাঁদের প্রয়োজনে আল্ট্রাসাউন্ড ও ফাইব্রোস্ক্যানও করানো দরকার।
কেন আগে থেকেই সতর্ক হওয়া জরুরি?
লিভারের অনেক রোগই দীর্ঘদিন কোনও লক্ষণ প্রকাশ করে না। অনেক সময় জন্ডিস, শরীর ফুলে যাওয়া বা রক্তক্ষরণের মতো উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর বোঝা যায় যে লিভারের অনেকটাই ক্ষতি হয়ে গেছে।
তাই উপসর্গের জন্য অপেক্ষা না করে ৩০ বছর পার হওয়ার পর থেকেই স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শরীরচর্চা, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং সময়মতো স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার অভ্যাস গড়ে তোলাই লিভারকে দীর্ঘদিন সুস্থ রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

No comments:
Post a Comment