ভারতের তিন দিনের সরকারি সফরে এসেছেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি। বৃহস্পতিবার নয়াদিল্লির রাষ্ট্রপতি ভবনে তাঁকে আনুষ্ঠানিক গার্ড অব অনার দিয়ে স্বাগত জানানো হয়। এরপর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং সানায়ে তাকাইচি একে অপরের মন্ত্রী ও প্রতিনিধিদলের সদস্যদের সঙ্গে পরিচয়পর্ব সম্পন্ন করেন। এই সফরকে ভারত-জাপান কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
এই সফরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হল হরিয়ানার খরখৌদা-য় মারুতি সুজুকির অত্যাধুনিক গাড়ি উৎপাদন কেন্দ্রের উদ্বোধন। প্রধানমন্ত্রী মোদী ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী যৌথভাবে এই প্রকল্পের উদ্বোধন করেন। এটি ভারতের অন্যতম বড় অটোমোবাইল উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠছে। সংস্থার পরিকল্পনা অনুযায়ী, সম্পূর্ণরূপে চালু হলে এই কারখানায় বছরে প্রায় ১০ লক্ষ গাড়ি উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি হবে।
এই প্রকল্পে প্রায় ₹৩৫,০০০ কোটি বিনিয়োগ করা হয়েছে। এর ফলে সরাসরি ২১ হাজারেরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে বলে জানানো হয়েছে। কারখানাটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) নির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হবে এবং ১০০ শতাংশ নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবহার করবে, যা পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সানায়ে তাকাইচির এই সফর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ২০২৫ সালের আগস্টে জাপান সফরের ধারাবাহিকতা। সেই সময় দুই দেশ আগামী এক দশকের জন্য একটি যৌথ কৌশলগত রূপরেখা ঘোষণা করেছিল। পাশাপাশি জাপান আগামী ১০ বছরে ভারতে ১০ ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের লক্ষ্যও ঘোষণা করে। বর্তমান সফরে সেই বিনিয়োগ, শিল্প সহযোগিতা এবং প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্বকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ভারত ও জাপানের মধ্যে বর্তমানে 'স্পেশাল স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড গ্লোবাল পার্টনারশিপ' কার্যকর রয়েছে। এই অংশীদারিত্ব শুধু বাণিজ্য বা বিনিয়োগে সীমাবদ্ধ নয়; প্রতিরক্ষা, সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, অবকাঠামো উন্নয়ন, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়েও দুই দেশের সহযোগিতা দ্রুত বাড়ছে। এছাড়া কোয়াড (Quad) জোটের সদস্য হিসেবে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিয়েও দুই দেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে।
জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, ১ থেকে ৩ জুলাই পর্যন্ত এই সফরে প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মধ্যে ১৬তম ভারত-জাপান বার্ষিক শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অগ্রগতি পর্যালোচনার পাশাপাশি ভবিষ্যতের সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র নিয়েও আলোচনা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সরবরাহ শৃঙ্খলের পুনর্গঠন এবং উন্নত প্রযুক্তির প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে ভারত ও জাপানের এই ঘনিষ্ঠতা আগামী দিনে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতি ও কৌশলগত ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। শিল্প, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা ও বিনিয়োগ—সব ক্ষেত্রেই এই সফর দুই দেশের সম্পর্ককে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

No comments:
Post a Comment