পশ্চিমবঙ্গে উচ্চপ্রযুক্তি শিল্পের বিকাশে নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত মিলেছে। জাপানের অন্যতম শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী মিৎসুবিশি রাজ্যে সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন ও সংশ্লিষ্ট শিল্প গড়ে তোলার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলে নবান্ন সূত্রে জানা গেছে। সম্প্রতি রাজ্যের শিল্প ও অর্থ দফতরের সঙ্গে সংস্থার প্রতিনিধিদের একটি প্রাথমিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে সম্ভাব্য বিনিয়োগ, জমি, পরিকাঠামো এবং শিল্পবান্ধব পরিবেশ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
সরকারি সূত্রের দাবি, বৈঠকে সম্ভাব্য প্রকল্পের জন্য দুর্গাপুর বা পানাগড় শিল্পাঞ্চলকে প্রাথমিকভাবে উপযুক্ত স্থান হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এই দুই এলাকায় পর্যাপ্ত জমি, উন্নত সড়ক ও রেল যোগাযোগ, বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং শিল্প পরিকাঠামো থাকায় সেগুলিকে সম্ভাব্য কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
শিল্পমন্ত্রী তাপস রায় জানিয়েছেন, মিৎসুবিশি গোষ্ঠী পশ্চিমবঙ্গে বিনিয়োগে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে এবং সেমিকন্ডাক্টর শিল্প গড়ে তোলার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তাঁর কথায়, প্রথম দফার বৈঠক অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সহায়তা, দ্রুত অনুমোদন এবং শিল্পবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে।
জানা গিয়েছে, চলতি মাসের মধ্যেই মিৎসুবিশির একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল পশ্চিমবঙ্গ সফরে আসতে পারে। সেই সফরে সম্ভাব্য প্রকল্প এলাকার জমি, যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ, জল, দক্ষ জনশক্তি এবং অন্যান্য শিল্প পরিকাঠামো সরেজমিনে পরিদর্শন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সূত্রের খবর, আলোচনায় মিৎসুবিশির প্রতিনিধিরা রাজ্যের শিল্পনীতি, জমি বরাদ্দের প্রক্রিয়া, বিদ্যুৎ সংযোগ, শ্রম আইন, পরিবেশগত ছাড়পত্র এবং দীর্ঘমেয়াদি শিল্প পরিচালনার সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানতে চান। রাজ্য সরকারও বিনিয়োগকারীদের জন্য দ্রুত পরিষেবা ও প্রশাসনিক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ সেমিকন্ডাক্টর শিল্প?
সেমিকন্ডাক্টর বা অর্ধপরিবাহী চিপ বর্তমানে বিশ্বের প্রায় সব আধুনিক প্রযুক্তির ভিত্তি। স্মার্টফোন, কম্পিউটার, বৈদ্যুতিক গাড়ি, চিকিৎসা সরঞ্জাম, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, টেলিযোগাযোগ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর প্রযুক্তিতে এই চিপ অপরিহার্য।
বিশ্বজুড়ে সেমিকন্ডাক্টরের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। সেই কারণেই ভারতও এই খাতে উৎপাদন বাড়াতে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকারের সেমিকন্ডাক্টর কর্মসূচির আওতায় দেশজুড়ে একাধিক প্রকল্পের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে এই ধরনের শিল্প স্থাপিত হলে কর্মসংস্থান, সহায়ক শিল্পের বিকাশ এবং প্রযুক্তিনির্ভর বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে বলে শিল্প বিশেষজ্ঞদের ধারণা।
আমূলের বিনিয়োগের পর আরও এক সম্ভাবনা
এর আগেই দেশের অন্যতম বৃহৎ দুগ্ধ সমবায় সংস্থা আমূল পশ্চিমবঙ্গে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছিল। দুগ্ধ প্রক্রিয়াকরণ ও সংশ্লিষ্ট শিল্পে কয়েকশো কোটি টাকার প্রকল্প নিয়ে রাজ্য সরকারের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় এবার মিৎসুবিশির সম্ভাব্য বিনিয়োগকে রাজ্যের শিল্পায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শিল্পমহলের মতে, যদি আলোচনার পর সব প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন হয়, তাহলে পশ্চিমবঙ্গ পূর্ব ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উচ্চপ্রযুক্তি শিল্পকেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে জমি নির্বাচন, পরিবেশগত অনুমোদন, বাণিজ্যিক সমীক্ষা এবং চূড়ান্ত বিনিয়োগ সিদ্ধান্তের মতো একাধিক ধাপ এখনও বাকি রয়েছে।
এখন নজর মিৎসুবিশির প্রতিনিধি দলের আসন্ন সফরের দিকে। সেই সফরের ফলাফলই নির্ধারণ করবে পশ্চিমবঙ্গে এই বহুল আলোচিত সেমিকন্ডাক্টর প্রকল্প বাস্তবায়নের সম্ভাবনা কতটা এগোয়।

No comments:
Post a Comment