রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পর মাত্র দুই মাসের মধ্যেই রাজস্ব আদায়ে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটেছে বলে দাবি করেছে নতুন প্রশাসন। মুখ্যমন্ত্রীর সচিবালয় সূত্রে জানানো হয়েছে, দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম এক মাসে গত অর্থবর্ষের একই সময়ের তুলনায় প্রায় এক হাজার কোটি টাকা বেশি রাজস্ব সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে। সরকারের দাবি, নতুন কোনও কর আরোপ না করেই এই অতিরিক্ত আয় সম্ভব হয়েছে।
সরকারি সূত্রের বক্তব্য, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, ডিজিটাল নজরদারি জোরদার এবং দীর্ঘদিনের রাজস্ব ফাঁকি রোধে কড়া পদক্ষেপ নেওয়ার ফলেই এই সাফল্য এসেছে। খনিজ সম্পদ, আবগারি, পরিবহণ, ভূমি-সংক্রান্ত রাজস্বসহ একাধিক ক্ষেত্রে বিশেষ নজরদারি শুরু হয়েছে। এর ফলে আগে যেসব খাতে সরকারের প্রাপ্য অর্থ পুরোপুরি আদায় হতো না, এখন সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটছে বলে দাবি করা হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রীর সচিবালয়ের অভিযোগ, পূর্ববর্তী প্রশাসনের আমলে রাজস্ব সংগ্রহ ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে এমন কিছু দুর্বলতা ছিল, যার সুযোগ নিয়ে বিপুল পরিমাণ সরকারি আয় কোষাগারে না পৌঁছে অন্যত্র চলে যেত। সেই অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরতেই রাজ্য সরকার একটি শ্বেতপত্র প্রকাশের প্রস্তুতি নিচ্ছে। অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি মন্ত্রিগোষ্ঠী ইতিমধ্যেই বিভিন্ন দফতর থেকে তথ্য সংগ্রহের কাজ শুরু করেছে।
সরকারি সূত্রে আরও দাবি করা হয়েছে, অতীতেও রাজস্ব সংগ্রহে স্বচ্ছতা আনতে আধুনিক ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান প্রশাসনের অভিযোগ, সেই ব্যবস্থার মধ্যেও একাধিক ফাঁক থেকে গিয়েছিল। বিশেষ করে বালি, কয়লা ও পাথর খাদান থেকে সরকারের যে পরিমাণ রাজস্ব পাওয়ার কথা ছিল, তার একটি বড় অংশ নিয়মিতভাবে কোষাগারে জমা পড়েনি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
প্রশাসনের দাবি, বর্তমানে অবৈধ উত্তোলন, ভুয়ো হিসাব এবং রাজস্ব ফাঁকি রোধে কঠোর নজরদারি চালানো হচ্ছে। ডিজিটাল পর্যবেক্ষণ, নিয়মিত পরিদর্শন এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সক্রিয়তার ফলে রাজস্ব সংগ্রহে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে বলে সরকারের বক্তব্য।
দুর্নীতির অভিযোগের উদাহরণ হিসেবে মুখ্যমন্ত্রীর সচিবালয় বীরভূমের একটি পাথর খাদানের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছে। সরকারের দাবি, আগের প্রশাসনের সময়ে ওই খাদান থেকে বছরে প্রায় ষাট কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হতো। অথচ সরকার পরিবর্তনের পর কঠোর নজরদারি চালু হওয়ার ফলে বর্তমানে একই খাদান থেকে প্রতি মাসেই প্রায় আশি থেকে নব্বই কোটি টাকা পর্যন্ত রাজস্ব আদায় হচ্ছে। সরকারের মতে, এই পরিসংখ্যানই অতীতের রাজস্ব ফাঁকির মাত্রা স্পষ্ট করে। যদিও এই দাবির স্বাধীন নিরীক্ষা বা সরকারি যাচাই এখনও প্রকাশ করা হয়নি।
সরকার জানিয়েছে, আবাসন, গ্রামীণ সড়ক বা একশো দিনের কাজের মতো প্রকল্পে সম্ভাব্য আর্থিক অনিয়মের বিষয় এই হিসাবের অন্তর্ভুক্ত নয়। বর্তমানে শুধুমাত্র রাজস্ব সংগ্রহের বিষয়টিই বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি আবগারি রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রেও বিশেষ পর্যালোচনা চলছে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী আরও অভিযোগ করেছেন, অতীতে সরকারি কোষাগারে জমা হওয়ার পরিবর্তে বিপুল অঙ্কের অর্থ অবৈধ আর্থিক চক্রের মাধ্যমে অন্যত্র সরিয়ে দেওয়া হতো। তাঁর দাবি, কলকাতার একটি বাণিজ্যিক এলাকা হয়ে হাওয়ালা নেটওয়ার্কের সাহায্যে সেই অর্থ বিদেশে পাচার করা হতো এবং বিভিন্ন শেল সংস্থার মাধ্যমে লেনদেন গোপন রাখা হতো। যদিও এই অভিযোগগুলির বিষয়ে এখনও তদন্তকারী সংস্থার চূড়ান্ত রিপোর্ট বা আদালতের রায় প্রকাশিত হয়নি।
রাজস্ব বৃদ্ধির এই দাবি ঘিরে রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। সরকার একে প্রশাসনিক সংস্কার ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের ফল হিসেবে তুলে ধরছে। অন্যদিকে বিরোধীদের দাবি, সমস্ত অভিযোগ ও পরিসংখ্যানের নিরপেক্ষ যাচাই হওয়া প্রয়োজন। ফলে সরকারের প্রস্তাবিত শ্বেতপত্র এবং ভবিষ্যতের সরকারি তথ্য প্রকাশের দিকেই এখন নজর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলের।

No comments:
Post a Comment