একসময় শিল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল। সেই আন্দোলনের জেরে বামফ্রন্ট সরকার প্রবল চাপে পড়ে এবং পরবর্তীতে সেই ইস্যুকেই রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগিয়ে ক্ষমতায় আসে তৃণমূল কংগ্রেস। পরে দীর্ঘদিন শিল্পের জন্য জোর করে জমি না নেওয়ার নীতির কারণে রাজ্যে নতুন শিল্পায়নও উল্লেখযোগ্যভাবে ধীর হয়ে যায় বলে বহু মহলে মত প্রকাশ করা হয়।
সিঙ্গুর আন্দোলনের প্রায় দুই দশক পর রাজ্যের নতুন সরকার শিল্পের জন্য জমি সংক্রান্ত নীতিতে বড় পরিবর্তনের ঘোষণা করেছে। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার দুই মাসের মধ্যেই শনিবার, ১১ জুলাই, ডানকুনিতে একটি বস্ত্র সংস্থার প্রায় ৬০০ কোটি টাকার নতুন উৎপাদন কেন্দ্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ৬ হাজার মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা রয়েছে।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানান, শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় জমি সংগ্রহের দায়িত্ব আর শুধু শিল্প সংস্থার ওপর ছেড়ে দেওয়া হবে না। সরকারের উদ্যোগেই জমি সংগ্রহ করা হবে, যাতে দালালচক্রের প্রভাব কমে এবং জমি নিয়ে অযথা জটিলতা তৈরি না হয়।
সরকারের নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় জমি সরকার সরাসরি কিনে নেবে এবং পরে তা সংশ্লিষ্ট শিল্প প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেবে। বর্তমানে কার্যকর আইন অনুযায়ী, জমির মালিকরা বাজারদরের পাশাপাশি অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণের সুবিধাও পাবেন। শহরাঞ্চলের ক্ষেত্রে বাজারদরের দ্বিগুণ এবং গ্রামীণ এলাকায় বাজারদরের চারগুণ পর্যন্ত মূল্য ও পুনর্বাসনের সুযোগ মিলতে পারে।
মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান, জমির সীমাবদ্ধতা সংক্রান্ত আইন বাতিল করার দিকেও সরকার এগোচ্ছে। তাঁর বক্তব্য, এই আইনের কারণে বৃহৎ শিল্প প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণ জমি একত্র করা কঠিন হয়ে পড়ে। আইনটি বাতিল হলে জমি কেনাবেচার প্রক্রিয়া আরও সহজ হবে এবং বড় বিনিয়োগের পথ সুগম হবে।
এছাড়া শিল্পে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করা হয়েছে। কোনও সংস্থা যদি ১০০ কোটির বেশি বিনিয়োগ করে, তাহলে ভবন নির্মাণের নকশা বা অন্যান্য প্রশাসনিক অনুমোদনের জন্য আলাদা করে জেলা পরিষদ, পুরসভা বা পঞ্চায়েতের অনুমতি নিতে হবে না।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, একটি কেন্দ্রীয় অনুমোদন ব্যবস্থার মাধ্যমে একই জায়গা থেকে প্রয়োজনীয় সব প্রশাসনিক ছাড়পত্র দেওয়া হবে। সরকারের দাবি, এতে হয়রানি কমবে, সময় বাঁচবে এবং শিল্প স্থাপনের প্রক্রিয়া অনেক দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এই নতুন জমি নীতি ভবিষ্যতে পশ্চিমবঙ্গে শিল্প ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

No comments:
Post a Comment