ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘদিনের সিন্ধু জল চুক্তিকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পাকিস্তান পিপলস পার্টির প্রধান বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি ভারতের বিরুদ্ধে কড়া মন্তব্য করেছেন। পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক সেমিনারে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি দাবি করেন, পাকিস্তানের জন্য নির্ধারিত নদীর জল আটকে দেওয়ার চেষ্টা করা হলে সেটিকে শুধু কূটনৈতিক বিরোধ হিসেবে নয়, বরং দেশের অস্তিত্বের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে দেখা হবে।
বিলাওয়াল ভুট্টো বলেন, পাকিস্তানের কৃষি, পানীয় জল, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং কোটি কোটি মানুষের জীবিকা সিন্ধু নদ ব্যবস্থা ও তার শাখা নদীগুলোর ওপর নির্ভরশীল। তাই জলপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি হলে তার প্রভাব শুধু অর্থনীতিতে নয়, দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তার ওপরও পড়বে। তিনি আরও দাবি করেন, এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে দুই দেশের মধ্যে সংঘাত অত্যন্ত বিপজ্জনক দিকে মোড় নিতে পারে। বক্তব্যে তিনি পারমাণবিক শক্তিধর দুই দেশের মধ্যে সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কার কথাও উল্লেখ করেন।
সিন্ধু জল চুক্তি কী?
সিন্ধু জল চুক্তি ১৯৬০ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়। বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় হওয়া এই চুক্তিতে ছয়টি নদীর জল বণ্টনের নিয়ম নির্ধারণ করা হয়।
চুক্তি অনুযায়ী রাভি, বিয়াস ও শতদ্রু নদীর জল ব্যবহারের প্রধান অধিকার ভারতের। অন্যদিকে সিন্ধু, ঝিলম ও চেনাব নদীর অধিকাংশ জল ব্যবহারের অধিকার পাকিস্তানের। তবে এই তিনটি নদীর ওপর ভারত সীমিত পরিসরে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও নির্দিষ্ট কিছু উন্নয়নমূলক কাজ করতে পারে, শর্ত হলো চুক্তির নিয়ম ভঙ্গ করা যাবে না।
কেন নতুন করে বিতর্ক?
সাম্প্রতিক সময়ে ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্কের অবনতির পর সিন্ধু জল চুক্তি নিয়ে আবারও আলোচনা শুরু হয়েছে। সীমান্তে উত্তেজনা, সন্ত্রাসবাদ নিয়ে দ্বন্দ্ব এবং কূটনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে দুই দেশের মধ্যে এই চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। পাকিস্তান একাধিকবার অভিযোগ করেছে যে, ভারতের বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কারণে তাদের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে ভারত বরাবরই জানিয়েছে, তাদের সমস্ত প্রকল্প সিন্ধু জল চুক্তির নিয়ম মেনেই পরিচালিত হচ্ছে।
বিলাওয়ালের বক্তব্যে কী বলা হয়েছে?
বিলাওয়াল ভুট্টো বলেন, জল পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত একটি বিষয়। যদি পাকিস্তানের জন্য নির্ধারিত জলপ্রবাহ বন্ধ করার চেষ্টা করা হয়, তাহলে তা দেশের সার্বভৌমত্ব ও অস্তিত্বের ওপর আঘাত হিসেবে বিবেচিত হবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, এমন পরিস্থিতি দুই দেশের মধ্যে অত্যন্ত গুরুতর সংঘাতের জন্ম দিতে পারে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
ভারতের অবস্থান
এই বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর পর্যন্ত ভারত সরকারের পক্ষ থেকে বিলাওয়াল ভুট্টোর মন্তব্যের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। তবে ভারত অতীতেও একাধিকবার জানিয়েছে যে, তারা আন্তর্জাতিক চুক্তির প্রতি সম্মান দেখায় এবং দেশের স্বার্থ রক্ষা করেই সিন্ধু জল ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করে।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
সিন্ধু জল চুক্তিকে বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী আন্তর্জাতিক জলবণ্টন চুক্তিগুলোর একটি হিসেবে ধরা হয়। ১৯৬০ সাল থেকে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একাধিক যুদ্ধ এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক উত্তেজনা সত্ত্বেও এই চুক্তি কার্যকর রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে এটি আবারও আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।
দ্রষ্টব্য: বিলাওয়াল ভুট্টোর পারমাণবিক সংঘাত সংক্রান্ত মন্তব্য তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক বক্তব্য। এটি কোনো সরকারি সিদ্ধান্ত বা ঘোষণার সমতুল্য নয়। বর্তমানে ভারত বা পাকিস্তান—কোনো দেশই এ ধরনের সামরিক পদক্ষেপের ঘোষণা দেয়নি।

No comments:
Post a Comment