অন্নপূর্ণা যোজনার আর্থিক সহায়তা নিয়ে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ক্ষোভ ক্রমেই বাড়ছে। আবেদন করার পরেও অ্যাকাউন্টে টাকা না আসা, যাচাইয়ের পর নাম তালিকায় না থাকা এবং আবেদনের অবস্থার বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য না পাওয়ার অভিযোগ তুলে শুক্রবার একাধিক জেলায় পথে নামেন মহিলারা। কোথাও প্রশাসনিক দফতর ঘেরাও হয়েছে, কোথাও রাস্তা ও রেল অবরোধ করে প্রতিবাদ দেখানো হয়েছে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটে পশ্চিম মেদিনীপুরে। জেলাশাসকের দফতরে একটি প্রশাসনিক বৈঠকে যোগ দিতে গিয়েছিলেন রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। সেই সময় অন্নপূর্ণা যোজনার সুবিধা না পাওয়া বেশ কিছু মহিলা দফতরের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। মন্ত্রীর কাছে পৌঁছে তাঁরা সরাসরি নিজেদের সমস্যার কথা জানান।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, দু’মাস আগে আবেদন করার পরেও তাঁদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে এখনও টাকা জমা পড়েনি। কারও আবেদন যাচাই হয়ে যাওয়ার পরেও অর্থ মেলেনি বলে দাবি, আবার কারও ক্ষেত্রে আবেদন সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানের জন্য এক দফতর থেকে অন্য দফতরে পাঠানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
পরিস্থিতি বুঝতে মন্ত্রী নিজেই বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে কথা বলেন। আবেদনকারীদের এনরোলমেন্ট নম্বর সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের কাছে জমা দিতে বলা হয়েছে। সেই নম্বরের ভিত্তিতে তাঁদের আবেদন কোন পর্যায়ে রয়েছে এবং কেন টাকা আটকে রয়েছে, তা খতিয়ে দেখার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রশাসনিক স্তরে নোডাল আধিকারিকের মাধ্যমে অভিযোগগুলি দেখার ব্যবস্থার কথাও সামনে এসেছে।
একাধিক জেলায় অবরোধ-বিক্ষোভ
শুধু পশ্চিম মেদিনীপুর নয়, শুক্রবার রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তেই অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা না পাওয়ার অভিযোগে প্রতিবাদ হয়েছে। বিরাটিতে রেল অবরোধের জেরে ট্রেন চলাচল ব্যাহত হয়। পাশাপাশি বেহালা চৌরাস্তা, ডায়মন্ড হারবার, বজবজ, কল্যাণী, পুরুলিয়া, বালুরঘাট-সহ একাধিক জায়গায় মহিলাদের বিক্ষোভের খবর সামনে এসেছে।
মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুরেও বৃহস্পতিবার শতাধিক মহিলা পুরসভা ঘেরাও করে বিক্ষোভ দেখান। আবেদন জমা দেওয়ার পরেও টাকা না পাওয়াই ছিল তাঁদের মূল অভিযোগ। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে পুলিশকে হস্তক্ষেপ করতে হয়।
কতজন টাকা পাচ্ছেন?
সরকারি প্রকল্পের বর্তমান হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ১ কোটি ৮০ লক্ষ আবেদন জমা পড়েছিল। তার মধ্যে প্রায় ১ কোটি ৬২ লক্ষ আবেদন যাচাই করা হয়েছে এবং প্রায় ১ কোটি ৪৫ লক্ষ মহিলাকে সুবিধাভোগী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাঁদের মাসে ৩,০০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
তবে প্রায় ১৭ লক্ষ আবেদন এখনও আটকে রয়েছে বা বাতিল হয়েছে। আধার ও ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের সংযোগের সমস্যা, যোগ্যতার শর্ত পূরণ না করা এবং তথ্যের অসঙ্গতি-সহ বিভিন্ন কারণে কিছু আবেদন আটকে থাকার কথা জানা গিয়েছে।
বাতিল আবেদনকারীদের জন্যও সুযোগ
এই পরিস্থিতির মধ্যেই সরকারের তরফে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের কথা জানানো হয়েছে। যাঁদের আবেদন বাতিল হয়েছে, তাঁদের জন্য ‘ক্লেম অ্যান্ড অবজেকশন’ ব্যবস্থার মাধ্যমে ফের নিজেদের দাবি জানানোর সুযোগ দেওয়া হবে। অর্থাৎ কোনও যোগ্য মহিলা ভুলবশত তালিকা থেকে বাদ পড়ে থাকলে, তিনি পুনরায় বিষয়টি জানিয়ে নিজের আবেদন পর্যালোচনার সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে অযোগ্য কেউ সুবিধা পেলে তাঁর বিরুদ্ধেও অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে।
আবেদন সংক্রান্ত তথ্য যাচাইয়ের জন্য অন্নপূর্ণা যোজনার পোর্টালও ফের সক্রিয় করা হয়েছে। ফলে আবেদনকারীরা নিজেদের আবেদনের বর্তমান অবস্থা অনলাইনে পরীক্ষা করতে পারবেন।
মন্ত্রীর মন্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক চাপানউতোর
বিক্ষোভের মধ্যে অগ্নিমিত্রা পাল অভিযোগ করেছেন, অন্নপূর্ণা যোজনাকে ঘিরে তৈরি হওয়া অশান্তির পিছনে তৃণমূলের কিছু লোকের ভূমিকা রয়েছে। তাঁর দাবি, দলের কিছু মানুষ ভিতর থেকে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করছেন। বিষয়টি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে জানাবেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।
তবে বিক্ষোভকারী মহিলাদের তিনি ধৈর্য ধরারও আবেদন জানিয়েছেন। সরকারের কাজ এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হলে প্রকৃত যোগ্য উপভোক্তাদের সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করা হবে বলে মন্ত্রীর তরফে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে, অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা পাওয়া নিয়ে রাজ্যজুড়ে যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, তা এখন প্রশাসনের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। একদিকে বিপুল সংখ্যক মহিলার অ্যাকাউন্টে নিয়মিত আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে, অন্যদিকে বাদ পড়া বা টাকা না পাওয়া আবেদনকারীদের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি করাই এখন সরকারের সামনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যাচাই প্রক্রিয়া ও অভিযোগ নিষ্পত্তি কত দ্রুত হয়, তার উপরই নির্ভর করবে আগামী দিনে এই ক্ষোভ কতটা কমে।

No comments:
Post a Comment