স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনও ধরনের ঢিলেমি বরদাস্ত করা হবে না। শনিবার, ১৫ অগস্ট কলকাতার রেড রোডে আয়োজিত স্বাধীনতা দিবসের মূল অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং কুচকাওয়াজকে কেন্দ্র করে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অনুষ্ঠানে একাধিক ভিভিআইপি ও ভিআইপির উপস্থিতি থাকার কারণে নিরাপত্তার প্রতিটি স্তরেই বিশেষ নজরদারি রাখা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমবঙ্গে পাকিস্তান-যোগের গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে একাধিক গ্রেফতারির ঘটনাও নিরাপত্তা পরিকল্পনায় বাড়তি গুরুত্ব পেয়েছে। মে মাসে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা NIA কলকাতার বাসিন্দা জাফর রিয়াজ ওরফে রিজভিকে পাকিস্তানি গোয়েন্দা আধিকারিকদের কাছে গোপন নিরাপত্তা-সংক্রান্ত তথ্য পাচারের অভিযোগে গ্রেফতার করেছিল।
এরই মধ্যে স্বাধীনতা দিবসের ঠিক আগে উত্তর ২৪ পরগনার সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে এক সন্দেহভাজন পাকিস্তানি গুপ্তচরকে গ্রেফতারের খবর সামনে এসেছে। তদন্তকারীদের দাবি, ওই ব্যক্তির যোগাযোগ পাকিস্তানের সামরিক ও গোয়েন্দা মহলের সঙ্গে ছিল এবং সেনা, সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও রেল পরিকাঠামো সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের অভিযোগ রয়েছে। ফলে ১৫ অগস্টের আগে গোটা কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকায় সতর্কতা আরও বাড়ানো হয়েছে।
ডিউটিতে মোবাইল ব্যবহার নয়
লালবাজারের তরফে কর্তব্যরত পুলিশকর্মীদের জন্য কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। ডিউটির সময়ে মোবাইল ফোনে অপ্রয়োজনীয়ভাবে ব্যস্ত থাকা, সেলফি তোলা কিংবা অনুষ্ঠানস্থলের ছবি-ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করার মতো কোনও কাজ করা যাবে না।
নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশকর্মীদের মূল কাজ হবে অনুষ্ঠানস্থল, দর্শক এবং ভিআইপি মুভমেন্টের দিকে অবিচ্ছিন্ন নজর রাখা। অতীতে দায়িত্ব পালনের সময় কিছু পুলিশকর্মীর ছবি তোলা বা সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করার প্রবণতা দেখা গেলেও এবার সেই বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠান শেষ না হওয়া পর্যন্ত দর্শকদের উপর নজর
রেড রোডে মূল অনুষ্ঠান চলাকালীন দর্শকদের গতিবিধির উপরও বিশেষ নজর রাখা হবে। সাধারণত মুখ্যমন্ত্রী মঞ্চ থেকে নেমে মাল্যদান বা অন্য কোনও কর্মসূচিতে গেলে দর্শকদের মধ্যে উৎসাহ তৈরি হয় এবং অনেকে রাস্তার দিকে এগিয়ে আসেন। এবার সেই পরিস্থিতি যাতে তৈরি না হয়, সে বিষয়ে আগাম ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
অনুষ্ঠান সম্পূর্ণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত দর্শকদের নির্দিষ্ট জায়গা থেকে রেড রোডের মূল অংশে ঢুকতে দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে পুলিশকর্মীদেরও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সতর্ক অবস্থানে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
একাধিক স্তরে নিরাপত্তা বলয়
নিরাপত্তা পরিকল্পনা অনুযায়ী রেড রোড এবং সংলগ্ন এলাকাকে একাধিক সেক্টরে ভাগ করে দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছে। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে সিনিয়র পুলিশ আধিকারিকদের নজরদারি থাকবে। সামগ্রিক নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবেন কলকাতা পুলিশের উচ্চপদস্থ আধিকারিকরা।
রেড রোডে বিপুল সংখ্যক পুলিশকর্মী মোতায়েনের পাশাপাশি কলকাতা পুলিশের স্পেশাল ফোর্স ও কম্যান্ডো বাহিনীও প্রস্তুত থাকবে। শহরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ এলাকাতেও অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হবে।
নজরদারির জন্য ওয়াচ টাওয়ার এবং নিরাপত্তা বাঙ্কারের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এর পাশাপাশি অনুষ্ঠানস্থলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে পুলিশ পিকেট ও কুইক রেসপন্স টিম প্রস্তুত থাকবে।
বম্ব স্কোয়াড ও সারমেয় বাহিনীর তল্লাশি
অনুষ্ঠানের আগে এবং অনুষ্ঠান চলাকালীন রেড রোড ও আশপাশের এলাকায় একাধিক দফায় তল্লাশি চালানো হবে। বম্ব ডিসপোজাল স্কোয়াড এবং প্রশিক্ষিত পুলিশ কুকুরের সাহায্যে সন্দেহজনক বস্তু ও জায়গা পরীক্ষা করা হবে।
দর্শকদের ভিড়ের মধ্যে সাদা পোশাকের পুলিশকর্মীরাও মোতায়েন থাকবেন। তাঁদের কাজ হবে সন্দেহজনক গতিবিধি দ্রুত চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের খবর দেওয়া।
শহরজুড়েও বাড়তি নজরদারি
শুধু রেড রোড নয়, কলকাতার গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ, বাজার, শপিং মল, ধর্মস্থান, মেট্রো স্টেশন, রেলস্টেশন এবং অন্যান্য জনবহুল এলাকাতেও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে নাকা চেকিং চলবে। সন্দেহজনক গাড়ি ও ব্যক্তিদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হবে। পাশাপাশি শহরের বিভিন্ন এলাকায় পুলিশ পিকেট ও টহলদারি জোরদার করা হয়েছে।
যান চলাচলেও প্রভাব পড়বে
স্বাধীনতা দিবসের কুচকাওয়াজ এবং ভিআইপি মুভমেন্টের কারণে রেড রোড ও ময়দান সংলগ্ন একাধিক রাস্তায় যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী কিছু রাস্তা বন্ধ রাখা এবং যানবাহনকে বিকল্প পথে ঘুরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা থাকবে।
কলকাতায় রেড রোডের বড় সরকারি অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে এ ধরনের ট্র্যাফিক নিয়ন্ত্রণ নতুন নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলিতেও স্বাধীনতা দিবসের আগে রেড রোডকে একাধিক জোনে ভাগ করে পুলিশ মোতায়েন, ওয়াচ টাওয়ার, বাঙ্কার, নাকা চেকিং এবং বিভিন্ন রাস্তায় যান নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
নিরাপত্তার পাশাপাশি দেশাত্মবোধের আবহ
এবারের স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে নিরাপত্তার পাশাপাশি বিশেষ সাংস্কৃতিক আয়োজনও থাকছে। ২০২৬ সালের রেড রোডের স্বাধীনতা দিবসের কুচকাওয়াজে প্রথমবার ‘বন্দে মাতরম্’ পরিবেশনের পরিকল্পনার কথাও প্রকাশ্যে এসেছে।
সব মিলিয়ে শনিবারের অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে রেড রোড ও কলকাতা শহরজুড়ে নিরাপত্তার একাধিক স্তর তৈরি করা হয়েছে। পুলিশের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা একটাই—অনুষ্ঠানের শুরু থেকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কোনও স্তরেই যাতে নিরাপত্তার ফাঁক না থাকে।

No comments:
Post a Comment