সন্ত্রাসবাদের ধারাবাহিক হুমকির কারণে ভারতের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে পাকিস্তান এখনও তাৎক্ষণিক উদ্বেগের কারণ। তবে আগামী বছরগুলিতে এবং দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও সামরিক—একাধিক ক্ষেত্রে চীনই ভারতের প্রধান প্রতিযোগী হয়ে উঠতে পারে। এমনই গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন ভারতের প্রাক্তন সেনাপ্রধান জেনারেল মনোজ মুকুন্দ নারাভানে।
বৃহস্পতিবার পুনেতে তাঁর নতুন বই The Curious and the Classified: Unearthing Military Myths and Mysteries প্রকাশের অনুষ্ঠানে ভারতের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং দুই প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে এই মন্তব্য করেন নারাভানে। বইটি প্রকাশ করেছে রূপা পাবলিকেশনস।
পাকিস্তান ও চীন—দুই দেশের চ্যালেঞ্জ আলাদা
নারাভানে স্পষ্ট করে বলেন, পাকিস্তান ও চীনকে একইভাবে দেখা যায় না। ভারতের দুই দেশের সঙ্গেই যুদ্ধ হয়েছে এবং দুই দেশের সঙ্গেই সীমান্ত সংক্রান্ত বিরোধ এখনও পুরোপুরি মেটেনি। ফলে দু’টি দেশই ভারতের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য হুমকি ও চ্যালেঞ্জ হিসেবে নজরে থাকবে।
তবে দুই দেশের চ্যালেঞ্জের ধরন আলাদা বলেই মনে করেন প্রাক্তন সেনাপ্রধান। তাঁর মতে, পাকিস্তানের ক্ষেত্রে ভারতের তাৎক্ষণিক উদ্বেগের অন্যতম প্রধান কারণ হল সন্ত্রাসবাদ এবং পশ্চিম সীমান্তের নিরাপত্তা। অন্যদিকে চীনের সঙ্গে ভারতের প্রতিযোগিতা আগামী দিনে আরও বিস্তৃত ও দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে।
‘শত্রু’ নয়, চীনকে ‘প্রতিযোগী’ বলতেই নারাভানের জোর
চীনের প্রসঙ্গে একটি বিষয় বিশেষভাবে স্পষ্ট করেছেন নারাভানে। তিনি ইচ্ছাকৃতভাবেই ‘শত্রু’ শব্দটি ব্যবহার না করে ‘প্রতিযোগী’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আগামী বছরগুলিতে চীন ভারতের প্রধান প্রতিযোগী হয়ে উঠবে। এই প্রতিযোগিতা শুধুমাত্র সামরিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। রাজনীতি, অর্থনীতি, বাণিজ্য এবং সামরিক ক্ষেত্র—সব ক্ষেত্রেই দুই দেশের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে।
নারাভানের এই বক্তব্যের তাৎপর্য হল, ভারত-চীন সম্পর্ককে শুধুমাত্র সীমান্ত সংঘাত বা সামরিক উত্তেজনার দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে বৃহত্তর কৌশলগত প্রতিযোগিতার পরিপ্রেক্ষিতে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।
চীনের সঙ্গে সংঘাত নয়, আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের বার্তা
চীনের সঙ্গে মতপার্থক্য থাকলেও তা সমাধানের ক্ষেত্রে আলোচনাকেই অগ্রাধিকার দেওয়ার পক্ষে সওয়াল করেছেন প্রাক্তন সেনাপ্রধান।
তিনি বলেন, ভারতকে চীনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিরোধ ও মতপার্থক্য আলোচনা, সংলাপ এবং কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মেটানোর চেষ্টা করতে হবে। তাঁর মতে, কোনও সমস্যার সমাধানে শক্তি প্রয়োগকে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে নেওয়া উচিত নয়; বলপ্রয়োগ সবসময়ই শেষ বিকল্প হওয়া উচিত।
তবে একইসঙ্গে তিনি সতর্ক করে দেন, কূটনৈতিক আলোচনা চললেও ভারতের সামরিক শক্তি ও প্রস্তুতিতে কোনও দুর্বলতা থাকা চলবে না। প্রয়োজনে যে কোনও পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য দেশের হাতে বিশ্বাসযোগ্য সামরিক প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকা জরুরি।
‘শান্তি চাইলে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে’
ভারতের নিরাপত্তা নীতি প্রসঙ্গে নারাভানে মূলত একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানের কথা বলেছেন—একদিকে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা, অন্যদিকে সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় শক্তিশালী সামরিক প্রস্তুতি।
তাঁর বক্তব্য, এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে যখন আলোচনার মাধ্যমে কোনও বিরোধ মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। সেই সময় দেশের কাছে শক্তিশালী সামরিক প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সম্ভাব্য ‘দুঃসাহসিক পদক্ষেপ’ বা আগ্রাসন ঠেকাতে সশস্ত্র বাহিনীকে সবসময় প্রস্তুত রাখতে হবে।
পাকিস্তানের গুরুত্বও কমছে না
চীনকে দীর্ঘমেয়াদি প্রধান প্রতিযোগী হিসেবে চিহ্নিত করলেও পাকিস্তানকে কোনওভাবেই ভারতের নিরাপত্তা সমীকরণ থেকে বাদ দেননি নারাভানে।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের অতীতে একাধিক বড় যুদ্ধ হয়েছে। সীমান্ত বিরোধ এখনও সম্পূর্ণ মেটেনি এবং সন্ত্রাসবাদের বিষয়টি ভারতের পশ্চিম সীমান্তকে ক্রমাগত নিরাপত্তার নজরে রাখছে। তাই পাকিস্তান আগামী দিনেও ভারতের জন্য একটি তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হিসেবে থেকে যাবে।
অর্থাৎ নারাভানের বিশ্লেষণে ভারতের সামনে মূলত দুই ধরনের চ্যালেঞ্জ—পাকিস্তান থেকে তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবাদের হুমকি, আর চীনের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বহুমাত্রিক প্রতিযোগিতা।
প্রতিবেশী দেশগুলির স্থিতিশীলতাও গুরুত্বপূর্ণ
ভারতের বৃহত্তর নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে বলতে গিয়ে নারাভানে প্রতিবেশী দেশগুলির স্থিতিশীলতার উপরও জোর দেন। নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ এবং মিয়ানমারের মতো প্রতিবেশী দেশগুলিতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা ভারতের স্বার্থের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তাঁর মতে, প্রতিবেশী দেশে অস্থিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব ভারতের উপরও পড়তে পারে। উদ্বাস্তু সমস্যা, চোরাচালান, মাদক পাচার এবং অবৈধ অস্ত্রের মতো বিভিন্ন সমস্যা সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করতে পারে।
নারাভানের বক্তব্যের মূল বার্তা
প্রাক্তন সেনাপ্রধানের বক্তব্যের সারকথা হল, পাকিস্তানকে ঘিরে ভারতের তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা উদ্বেগ থাকলেও ভবিষ্যতের বৃহত্তর কৌশলগত প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে চীন।
তবে সেই প্রতিযোগিতাকে সরাসরি শত্রুতায় পরিণত না করে কূটনীতি ও আলোচনার মাধ্যমে সম্পর্ক পরিচালনার পাশাপাশি ভারতের সামরিক শক্তিকে বিশ্বাসযোগ্য অবস্থায় রাখতে হবে। অর্থাৎ নারাভানের দৃষ্টিতে ভারতের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কৌশলে কূটনীতি ও সামরিক প্রস্তুতি—দুটিই পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ।
জেনারেল মনোজ মুকুন্দ নারাভানে ৩১ ডিসেম্বর ২০১৯ থেকে ৩০ এপ্রিল ২০২২ পর্যন্ত ভারতের সেনাপ্রধানের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি ২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের সময়ও সেনাপ্রধান ছিলেন।

No comments:
Post a Comment