৫৮ বিধায়কের সমর্থন বনাম দলের সিদ্ধান্ত! ঋতব্রত-শোভনদেব বিতর্কে হাইকোর্টের রায়ের দিকে নজর - Press Card News

Breaking

Post Top Ad

Post Top Ad

Tuesday, August 18, 2026

৫৮ বিধায়কের সমর্থন বনাম দলের সিদ্ধান্ত! ঋতব্রত-শোভনদেব বিতর্কে হাইকোর্টের রায়ের দিকে নজর


কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বিরোধী দলনেতার পদ নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরের যে সংঘাত শুরু হয়েছিল, তা এখন গড়িয়েছে কলকাতা হাইকোর্ট পর্যন্ত। একদিকে দলের তরফে মনোনীত প্রবীণ বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, অন্যদিকে দল থেকে বহিষ্কৃত বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়—দুই পক্ষের দাবিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে জটিল সাংবিধানিক ও পরিষদীয় প্রশ্ন।

মামলার শুনানি শেষ হওয়ার পর কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি শম্পা সরকার ও বিচারপতি অজয় কুমার গুপ্তের ডিভিশন বেঞ্চ রায় সংরক্ষণ করেছে। ফলে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহলের।

বিরোধের সূত্রপাত কোথায়?

২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস ৮০টি আসনে জয় পায়। সেই হিসেবে বিধানসভায় প্রধান বিরোধী দল হিসেবে তৃণমূলের অবস্থান তৈরি হয়।

নির্বাচনের পর দলের শীর্ষ নেতৃত্বের তরফে প্রবীণ নেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। দলের সিদ্ধান্ত জানিয়ে বিধানসভার অধ্যক্ষের কাছেও চিঠি দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু এর মধ্যেই তৃণমূলের একাংশ দলীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। উলুবেড়িয়া পূর্বের বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে বিদ্রোহী বিধায়কদের একটি গোষ্ঠী আলাদা অবস্থান নেয় এবং বিরোধী দলনেতা হিসেবে ঋতব্রতর নাম সামনে আনে।

৮০ জনের মধ্যে ৫৮ জনের স্বাক্ষর

এই গোটা বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা হল ৫৮।

ঋতব্রতপন্থী শিবির দাবি করে, তৃণমূলের মোট ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৫৮ জন বিধায়ক লিখিতভাবে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে রয়েছেন। তাঁদের স্বাক্ষর করা একটি চিঠি বিধানসভার অধ্যক্ষের কাছে জমা দেওয়া হয়।

সেই চিঠিতে ঋতব্রতকে পরিষদীয় দলের নেতা তথা বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানানো হয়। ৩ জুন অধ্যক্ষ রথীন্দ্র বসু ওই নতুন পরিষদীয় গোষ্ঠীর দাবি গ্রহণ করেন এবং ঋতব্রতকে বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেন।

অর্থাৎ, ৮০ জন তৃণমূল বিধায়কের মধ্যে ৫৮ জনের সমর্থন ঋতব্রতের পক্ষে থাকার দাবি—এই মামলার অন্যতম প্রধান ভিত্তি।

দল থেকে বহিষ্কার হয়েছিলেন ঋতব্রত

বিতর্ক আরও জটিল হয়ে ওঠে অন্য একটি কারণে। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে তৃণমূল নেতৃত্ব দলবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে বহিষ্কার করেছিল।

তৃণমূলের তরফে প্রশ্ন তোলা হয়, একজন বিধায়ককে দল থেকে বহিষ্কার করার পর তাঁকে কীভাবে সেই দলের বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া যায়?

অন্যদিকে, অধ্যক্ষের সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি ছিল—ঋতব্রতের বহিষ্কার দলীয় সংবিধান অনুযায়ী বৈধভাবে হয়েছে কি না, সেটিও বিবেচনার বিষয়। এই জায়গাতেই স্পিকারের সিদ্ধান্তের সাংবিধানিক ও পরিষদীয় ক্ষমতা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়।

শোভনদেবের পক্ষের বক্তব্য কী?

শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের পক্ষ থেকে মূল যুক্তি দেওয়া হয়, বিধানসভায় নির্বাচিত ৮০ জন বিধায়কই তৃণমূলের প্রতীকে নির্বাচনে জিতেছেন। ফলে বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করা যায় না।

তৃণমূলের পক্ষ থেকে শোভনদেবের নাম আগেই নির্ধারণ করা হয়েছিল। তাই দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কয়েক ডজন বিধায়ক আলাদা করে কাউকে বিরোধী দলনেতা ঘোষণা করতে পারেন কি না, সেটিই মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে ওঠে।

আদালতে স্পিকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন

মামলার শুনানিতে কলকাতা হাইকোর্ট স্পিকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়েও একাধিক প্রশ্ন তোলে।

১১ জুনের শুনানিতে আদালত জানতে চেয়েছিল, কোনও রাজনৈতিক দলের সম্মতি ছাড়া বিধানসভার অধ্যক্ষ কাউকে বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে পারেন কি না।

পরে শুনানিতে আদালতের সামনে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে—একদিকে রয়েছে রাজনৈতিক দলের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত, অন্যদিকে রয়েছে বিধানসভায় একই দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়কের স্বাক্ষর করা দাবি।

ফলে বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত পদ নিয়ে বিরোধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে দলীয় কর্তৃত্ব বনাম পরিষদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রশ্ন।

৫৮ জনের সমর্থন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

ঋতব্রত শিবিরের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি এখানেই। ৮০ জন তৃণমূল বিধায়কের মধ্যে ৫৮ জনের স্বাক্ষরিত সমর্থন থাকলে বিধানসভার ভিতরে সংখ্যার বিচারে তাঁর অবস্থান অত্যন্ত শক্তিশালী বলে দাবি করা যায়।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৪ জুন ৫৮ জন বিধায়কের স্বাক্ষর করা চিঠির মাধ্যমে বিদ্রোহী গোষ্ঠী বিধানসভায় নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে। ওই গোষ্ঠী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দলের সামগ্রিক নেত্রী হিসেবেও স্বীকার করেছিল।

অর্থাৎ, বিদ্রোহী গোষ্ঠীর দাবি ছিল—তারা দল ছেড়ে নতুন রাজনৈতিক দল তৈরি করেনি; বরং বিধানসভায় তৃণমূলের পরিষদীয় গোষ্ঠীর প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব তাদের কাছেই রয়েছে।

আদালতে উঠেছে আরও বড় প্রশ্ন

এই মামলার মধ্য দিয়ে কার্যত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—

বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্তই কি চূড়ান্ত?

নাকি—

বিধানসভায় সেই দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়কের লিখিত সমর্থন বেশি গুরুত্বপূর্ণ?

আর একজন বিধায়ক দল থেকে বহিষ্কৃত হলে, তিনি কি সেই দলের বিধানসভা গোষ্ঠীর নেতা বা বিরোধী দলনেতা হতে পারেন?

এই প্রশ্নগুলির উত্তরই নির্ধারণ করতে পারে ভবিষ্যতে বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের পদ্ধতি নিয়ে নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি হবে কি না।

হাইকোর্টে শুনানি শেষ, রায় সংরক্ষিত

দীর্ঘ শুনানিতে দুই পক্ষের বক্তব্য শোনার পর ডিভিশন বেঞ্চ মামলার রায় সংরক্ষণ করেছে। শুনানির শেষ পর্যায়ে স্পিকারের পক্ষ থেকেও ৮০ জনের মধ্যে ৫৮ জন বিধায়কের সমর্থনের বিষয়টি আদালতের সামনে তুলে ধরা হয়।

অন্যদিকে শোভনদেবের পক্ষ থেকে জোর দেওয়া হয়েছে দলের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত এবং রাজনৈতিক সংগঠনের কর্তৃত্বের উপর।

ফলে আদালতের রায় শুধু ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় নাকি শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়—কে বিরোধী দলনেতা থাকবেন, সেই প্রশ্নের উত্তর দেবে না। এর পাশাপাশি বিধানসভায় কোনও রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা, দলীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত এবং স্পিকারের সাংবিধানিক ভূমিকার সীমারেখা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিতে পারে।

৫৮ জন বিধায়কের স্বাক্ষর বনাম দলের আনুষ্ঠানিক মনোনয়ন—এই দুইয়ের মধ্যে আদালত কোন যুক্তিকে কতটা গুরুত্ব দেয়, এখন সেটাই দেখার।

No comments:

Post a Comment

Post Top Ad