কলকাতা: নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্যের জের, রাজ্যসভার বিজেপি সাংসদ অনন্ত মহারাজ ওরফে নগেন্দ্র রায়ের বঙ্গবিভূষণ সম্মান কাড়ল রাজ্য সরকার। বৃহস্পতিবার রাজ্য তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের তরফে বঙ্গবিভূষণ সম্মান কেড়ে নেওয়ার বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। উল্লেখ্য, ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনের আগে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দেশপ্রিয় পার্কের অমর একুশে উদ্যানে ভাষাদিবসের অনুষ্ঠানে অনন্ত মহারাজকে বঙ্গবিভূষণ সম্মান দিয়েছিলেন।
নেতাজিকে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করলে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে, এই নির্দেশ আগেই দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন, দেশনায়ককে অসম্মান কোনওভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। সেই মতোই এবারে কড়া পদক্ষেপ শুভেন্দু সরকারের।
সম্প্রতি, নেতাজিকে নিয়ে বিজেপির রাজ্যসভার সাংসদ অনন্ত মহারাজের করা মন্তব্যকে ঘিরে তোলপাড় রাজ্য-রাজনীতি। নিন্দার ঝড় উঠেছে সর্বত্র। ইতিমধ্যেই তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় অভিযোগ দায়ের হয়েছে। তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষও তাঁর সাংসদপদ খারিজের আবেদন করেছেন। এমনকি নিজের দলের সাংসদের বিরুদ্ধে সরব হন বিজেপি নেতা-মন্ত্রীরাও।
এরপর বুধবারেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন, নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু সম্পর্কে যাঁরা কটূক্তি করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে গ্রেফতারও করা হবে। তারপর থেকেই প্রশ্ন উঠছিল, অনন্ত মহারাজকেও গ্রেফতার করা হবে কি না। নাম না করলেও মুখ্যমন্ত্রীর স্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল, 'আইন সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হবে।' এরপর বৃহস্পতিবারেই অনন্ত মহারাজের বিরুদ্ধে এই পদক্ষেপ রাজ্য সরকারের।
নবান্নের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, "রাজ্য এবং রাজ্যবাসীর প্রতি বিশিষ্ট অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এই সম্মান তাঁকে প্রদান করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে কিছু বিষয় সরকারের নজরে এসেছে যা অত্যন্ত গুরুতর। তার ফলে অনন্তের এই সম্মান বঙ্গবিভূষণের মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এ বিষয়ে যাবতীয় তথ্য বিবেচনা করে দেখা গিয়েছে, অনন্তের কাছে বঙ্গবিভূষণ থাকা এই সম্মানের মর্যাদা ও প্রতিপত্তির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। তাই তাঁকে দেওয়া বঙ্গবিভূষণ অবিলম্বে প্রত্যাহার করা হল। এরপর থেকে অনন্ত নিজেকে বঙ্গবিভূষণ প্রাপক বলে পরিচিত করতে পারবেন না।”
কী কারণে বিজেপি সাংসদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করা হল, বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ না করলেও জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, এর পর থেকে 'বঙ্গবিভূষণ' হিসেবে কোনও সুযোগসুবিধা আর তিনি পাবেন না। সংশ্লিষ্ট তালিকা থেকে তাঁর নাম মুছে ফেলার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে কর্তৃপক্ষকে।
সম্প্রতি নেতাজিকে নিয়ে অনন্ত মহারাজের মন্তব্য নিয়ে বিতর্ক দানা বেঁধেছে। তিনি দাবী করেন, ভারতের স্বাধীনতায় নেতাজির কোনও ভূমিকা ছিল না। এমনকি, আজাদ হিন্দ ফৌজের অপব্যবহার করেছিলেন নেতাজি। এর পরেই বিতর্কের আগুনে ঘি পড়ে। বুধবার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নবান্ন থেকে একটি সাংবাদিক বৈঠক করে জানান, নেতাজিকে নিয়ে কুমন্তব্য করলে কাউকে রেয়াত করা হবে না। রাজনীতির রং না দেখে পদক্ষেপ করবে পুলিশ। সেই মতো নির্দেশ দেওয়া হয় সাইবার সেলকেও। নেতাজির সম্মানহানি করে কে কোন পোস্ট করেছেন, সমাজমাধ্যমে তা চিহ্নিত করার কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণার পর উত্তর দিনাজপুরে বৃহস্পতিবার এক যুবককে গ্রেফতারও করেছে পুলিশ। তাঁর বিরুদ্ধে নেতাজিকে নিয়ে আপত্তিকর পোস্টের অভিযোগ রয়েছে।
প্রসঙ্গত, অনন্ত মহারাজ বিজেপির রাজ্য সভার সাংসদ। তৃণমূল সরকারের আমলে চলতি বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি তিনি বঙ্গ বিভূষণ সম্মান পেয়েছিলেন। আর নেতাজিকে নিয়ে কুমন্তব্যের জেরে মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই তাঁর কাছ থেকে এই সম্মান কেড়ে নিল রাজ্য।

No comments:
Post a Comment