ওয়ার্ল্ড ডেস্ক, ১০ আগস্ট ২০২৬: ইরানের সাথে চলমান সামরিক সংঘাতের অবসান ঘটাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন পারমাণবিক চুক্তির চেয়ে হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু করাকে অগ্রাধিকার দিতে পারেন। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের একটি প্রতিবেদন অনুসারে, ট্রাম্প তাঁর ঘনিষ্ঠ আধিকারিকদের ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, যদি ইরান হরমুজ প্রণালীতে নৌ-চলাচল সম্পূর্ণরূপে পুনরুদ্ধার করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক চুক্তি ছাড়াই সংঘাতের অবসান ঘটানোর একটি উপায় খুঁজতে পারে।
কিন্তু, হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালুর জন্য ইরান এমন শর্ত আরোপ করেছে যে একটি চুক্তিতে পৌঁছানো কঠিন বলে মনে হচ্ছে। তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে শত শত কোটি ডলার পরিশোধ, নৌ অবরোধের অবসান, এই অঞ্চল থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং অন্যান্য ছাড় দাবী করেছে।
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার হুমকি সেখানে নৌ-চলাচল ব্যাহত করেছে, যার ফলে বিশ্বব্যাপী তেলের বাজারে অস্থিরতা বেড়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বারবার দাবী করেছেন যে, হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ উন্মুক্ত, কিন্তু ইরানের অবস্থান ভিন্ন। তেহরান মার্কিন যুদ্ধজাহাজ এবং তার মিত্রদের জাহাজ চলাচলে আপত্তি জানিয়েছে। ইরান এই পথ ব্যবহারের জন্য বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর মাশুল আরোপের প্রস্তাবও দিয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যাখ্যান করেছে।
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহাম্মদ বাঘের যুলঘাদর হরমুজ প্রণালী পুনরায় খোলার জন্য বেশ কয়েকটি শর্তের তালিকা দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে মার্কিন যুদ্ধের স্থায়ী অবসান, নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, এই অঞ্চল থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার, ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং ইরানের বাজেয়াপ্ত সম্পদ মুক্তি।
এছাড়া, ইরান যুদ্ধের ক্ষতিপূরণও দাবী করেছে। তেহরান চায় যুক্তরাষ্ট্র যেন ইরানের বিরুদ্ধে হুমকি ও বাগাড়ম্বর বন্ধ করে এবং এই অঞ্চলে ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযান স্থগিত করে।
প্রতিবেদন অনুসারে, দ্রুত সংঘাতের অবসান ঘটানোর জন্য ট্রাম্পের ওপর অভ্যন্তরীণ চাপও বাড়ছে। মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আর তিন মাসেরও কম সময় বাকি থাকায়, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সর্বোচ্চ দামের চেয়েও পেট্রোলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি রয়েছে। ট্রাম্পকে এমনভাবে সংঘাতের অবসান ঘটানোর চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে, যা তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একটি সাফল্য হিসেবে উপস্থাপন করতে পারেন। হরমুজে নৌচলাচল পুনরায় শুরু হওয়াটা এই ধরনের রাজনৈতিক সুবিধা এনে দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনার সবচেয়ে বড় উৎস হল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। ট্রাম্প প্রশাসন ধারাবাহিকভাবে বলে আসছে যে, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া হবে না। তবে, ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের মতে, ট্রাম্প সাম্প্রতিক বৈঠকে আধিকারিকদের বলেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ক্ষতি করার পর তেহরানের পক্ষে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুনরায় শুরু করা কঠিন হতে পারে।
ট্রাম্প বিশ্বাস করেন যে, মার্কিন গোয়েন্দারা ইরানের যেকোনও নতুন পারমাণবিক কার্যকলাপ শনাক্ত করতে পারবে এবং প্রয়োজনে সামরিক পদক্ষেপের হুমকি ইরানকে পুনরায় পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখতে পারে। এই চিন্তাভাবনার কারণে ট্রাম্প প্রশাসন হয়তো অবিলম্বে একটি পারমাণবিক চুক্তি সম্পাদনের চেয়ে হরমুজ প্রণালীতে নৌচলাচল পুনরুদ্ধারকে অগ্রাধিকার দিতে পারে।
একটি সম্ভাব্য চুক্তির ক্ষেত্রে সবচেয়ে কঠিন বিষয়গুলোর মধ্যে একটি হতে পারে ইরানের অর্থনৈতিক দাবঘগুলো। তেহরান শত শত কোটি ডলার যুদ্ধ ক্ষতিপূরণ এবং বিদেশে বাজেয়াপ্ত করা সম্পদ মুক্তির দাবী করছে। ট্রাম্প ইতোমধ্যেই বলেছেন যে, আমেরিকান করদাতাদের অর্থ ইরানকে দেওয়া হবে না। তবে, মার্কিন কর্তাদের মতে, যেকোনও চুক্তিতে শর্তসাপেক্ষে ইরানের কিছু বাজেয়াপ্ত সম্পদ মুক্তির বিষয়টি বিবেচনার প্রয়োজন হতে পারে। এছাড়াও, ইরানকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল বিক্রির অনুমতি দেওয়া এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিল করাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে।
পারমাণবিক চুক্তি ছাড়াই কি সংঘাতের অবসান ঘটবে?
ইরান যদি হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণরূপে পুনরুদ্ধার করতে সম্মত হয়, তবে ট্রাম্প পারমাণবিক চুক্তি ছাড়াই সংঘাতের অবসানের পথ খুলে দিতে পারেন। কিন্তু ইরানের বর্তমান দাবীগুলো থেকে বোঝা যায় যে, তেহরান শুধুমাত্র প্রণালীটি খুলে দেওয়ার বিনিময়ে মার্কিন ছাড় আদায় করতে চায়। ফলস্বরূপ, আগামী দিনগুলোতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু পারমাণবিক কর্মসূচি থেকে সরে গিয়ে হরমুজ প্রণালী, নিষেধাজ্ঞা, মার্কিন সামরিক উপস্থিতি এবং অর্থনৈতিক ক্ষতিপূরণের দিকে চলে যেতে পারে।

No comments:
Post a Comment