কলকাতা: রাজ্যে সবেমাত্র পালাবদল হয়েছে। সোমবার নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা হয়েছে। তৃণমূলের শোচনীয় পরাজয় হয়েছে। আর পরের দিনই দল ছাড়ার ঘোষণা ভারতের প্রাক্তন ক্রিকেটার তথা তৃণমূল কংগ্রেসের বিদায়ী বিধায়ক মনোজ তিওয়ারি। মঙ্গলবার তিনি বলেছেন, তাঁর জীবনে তৃণমূলের অধ্যায় শেষ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী ছিলেন মনোজ তিওয়ারি। এদিন পিটিআই-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, তিনি দল ছাড়ছেন। পাশাপাশি সমাজমাধ্যমে তাঁর পোস্ট 'পাপ বাপকেও ছাড়ে না।'
উল্লেখ্য, ৪০ বছর বয়সী ভারতের প্রাক্তন ব্যাটসম্যান এবং বাংলা ক্রিকেটের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক (প্রথম-শ্রেণির ক্রিকেটে ১০,১৯৫ রান)। এদিন সমাজমাধ্যম পোস্টে মনোজ তিওয়ারি লেখেন, 'পাপ বাপকেও ছাড়ে না। পশ্চিমবঙ্গের জনগণের এই প্রত্যাখ্যান তৃণমূল কংগ্রেসের প্রাপ্য।'
সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, "এই শোচনীয় পরাজয়ে আমি মোটেও অবাক হইনি। যখন পুরো দল দুর্নীতিতে নিমজ্জিত এবং কোনও ক্ষেত্রেই কোন উন্নয়ন হয়নি, তখন এমনটাই হওয়ার ছিল। কেবল তারাই টিকিট পেয়েছে যাদের মোটা অঙ্কের টাকা দেওয়ার সামর্থ্য ছিল। এবার অন্তত ৭০ থেকে ৭২ জন প্রার্থী টিকিট নিশ্চিত করতে প্রায় ৫ কোটি টাকা দিয়েছেন। আমার কাছেও টাকা চাওয়া হয়েছিল, কিন্তু আমি রাজি হইনি। শুধু দেখুন, যারা টাকা দিয়েছিল তাদের মধ্যে কতজন আসলে নির্বাচনে জিতেছে। তিনি বলেন, 'আমার জীবনে তৃণমূলের অধ্যায় শেষ।' মনোজ তিওয়ারি বলেছেন, “তৃণমূলের কথা বললে, আমার জন্য সেই অধ্যায়টি এখন পুরোপুরি শেষ।”
মনোজ তিওয়ারি বলেন, ২০১৯ সালে তৃণমূল কংগ্রেস তাঁকে লোকসভার টিকিট দিলেও রাজনীতিতে আসার কোনও ইচ্ছা তাঁর ছিল না। অবশেষে তিনি ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে শিবপুর থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়ী হন। তিনি বলেন, "সেই সময় আমি আইপিএলে পাঞ্জাব কিংসের হয়ে খেলছিলাম এবং রঞ্জি ট্রফিতে খেলার ব্যাপারে মনস্থির করেছিলাম, ঠিক তখনই দিদি (মমতা) আমাকে লোকসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে বলেন।"
মনোজ তিওয়ারি বলেন, “আমি বিনয়ের সাথে প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেছিলাম, কিন্তু ২০২১ সালের নির্বাচনের আগে দিদি আমাকে আবার ফোন করে শিবপুর থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে বলেন এবং আমি ভেবেছিলাম যে আমি কিছু অর্থপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারব।” তিনি অভিযোগ করেন যে, তৃণমূল কংগ্রেসে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের অভাব রয়েছে।"
তিনি বলেন, “আমি এমন সভায় উপস্থিত থেকেছি যেখানে তৃণমূলের সমস্ত মন্ত্রীদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। প্রতিমন্ত্রী নাম করে আমার হাতে স্রেফ একটা ‘ললিপপ’ ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যার কোনও মানেই ছিল না। আমি যদি উঠে দাঁড়িয়ে বলতাম, “দিদি, আমি একটা নির্দিষ্ট সমস্যার দিকে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই,” তিনি আমাদের কথা থামিয়ে দিয়ে বলতেন, তোমাদের জন্য আমার সময় নেই'।”
মনোজ তিওয়ারি বলেছেন যে, তাঁর বারবার চেষ্টা সত্ত্বেও হাওড়া জেলার দুর্বল পয়ঃনিষ্কাশন ও নিকাশী ব্যবস্থার দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার সমাধান কখনও হয়নি। তিনি বলেন, "একজন বর্তমান বিধায়ক হিসেবে আমি আমার নির্বাচনী এলাকায় নিকাশী ব্যবস্থার কাজ করানোর জন্য সব জায়গায় ছুটেছি, কিন্তু যারা বছরের পর বছর হাওড়া পৌরসভা ধরে রেখেছিল এবং নির্বাচন আটকে রেখেছিল, তারা কখনও পাত্তা দেয়নি।" এই প্রাক্তন ক্রিকেটার বলেন, "খুব সাধারণ মানের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতেও তারা কেবল বাধা দিয়ে গেছে।"
বিদায়ী ক্রীড়া মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধেও গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন প্রাক্তন ক্রিকেটার। তিনি বলেন, রাজ্যের ক্রীড়াঙ্গন সম্পর্কে তাঁর কোনো ধারণাই নেই।
তিওয়ারি বলেন, "অরূপ দা কোনও খেলার এ-বি-সি-ডি কিছুই জানেন না। এমন অনুষ্ঠানও হতো যেখানে অরূপ দা এবং আমাকে দুজনকেই আমন্ত্রণ জানানো হতো, কিন্তু আমাকে মঞ্চে ডাকা হতো না। একবার ডুরান্ড কাপ উন্মোচন অনুষ্ঠানে ক্রীড়া পাতায় আমার ছবি ছাপা হয়েছিল, আর তার পরের ডুরান্ড কাপ থেকেই আমি কোন আমন্ত্রণ পেতাম না।"
উল্লেখ্য, এবারের নির্বাচনে অরূপ বিশ্বাস ৬,০০০ ভোটে বিজেপি প্রার্থী পাপিয়া অধিকারীর কাছে হেরে যান। মন্ত্রীর মেয়াদের অন্যতম প্রধান বিতর্কিত ঘটনা ছিল লিওনেল মেসির কলকাতা সফর, যা এক চরম বিপর্যয়ে পরিণত হয়েছিল।
মনোজ তিওয়ারি এও জানান, তিনি অন্য কোনও রাজনৈতিক দলে যোগ দিতে আগ্রহী নন।


No comments:
Post a Comment