কলকাতা: বিধানসভা নির্বাচনের পর থেকে বাংলার রাজনৈতিক আবহ ক্রমাগত বদলাচ্ছে। একের পর এক দলের নেতা-কর্মীদের পদত্যাগের কারণে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তৃণমূল কংগ্রেস ক্রমাগত ধাক্কা খাচ্ছে। এই আবহে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে বাদ দিয়ে একটি নতুন তৃণমূল কংগ্রেস দল গঠনের আলোচনা নিয়ে জল্পনা শুরু হয়েছে। বিধানসভায় সই বিতর্ক নিয়ে দলের বিরুদ্ধে মুখ খোলার কারণে তৃণমূল কংগ্রেসের দুই বিধায়ক; ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সন্দীপন সাহাকে দল থেকে বহিষ্কার করার পর এই বিষয়টি সামনে আসে।
দল থেকে দু'জন বিধায়ককে বহিষ্কার করার পর অনেকেই এখন প্রশ্ন তুলছেন, বাংলায় ‘মহারাষ্ট্র মডেল’-এর পুনরাবৃত্তি ঘটানোর প্রস্তুতি চলছে না তো? ২০২২ সালে মহারাষ্ট্রে শিবসেনার মধ্যে যে বিভাজন ঘটেছিল, ঠিক সেইরকম বিভাজন তৃণমূল কংগ্রেসের মধ্যেও ঘটানোর কোনও পরিকল্পনা চলছে কি?
নির্বাচনের পর থেকেই বাংলার রাজনীতিতে তোলপাড় চলছে। এখন দুই বিধায়কের বহিষ্কারের ঘটনায় দল ভাঙার সম্ভাবনা আরও জোরদার হয়েছে। গুঞ্জন চলছে যে, প্রায় ৫০ জন বিধায়ক তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে যেতে পারেন। এমনও দাবী করা হচ্ছে যে কিছু সাংসদ বিদ্রোহ করার কথা ভাবছেন এবং এ বিষয়ে আলোচনাও করছেন।
সূত্রের খবর, ইতিমধ্যেই তৃণমূলের অনেক বিধায়কই ঋতব্রত এবং সন্দীপন সাহার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে শুরু করেছেন। বিদ্রোহী এই দুই বিধায়ককে কেন্দ্র করেই তৃণমূলে বড়সড় ফাটল ধরে কি না, সেই প্রশ্নও ঘুরছে রাজনৈতিক মহলে। আর এই সূত্রেই উঠে আসছে মহারাষ্ট্র মডেলের কথা।
তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসভবনে ডাকা সভাতেও বহু বিধায়ক অনুপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে কেউ কেউ দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলছেন। এছাড়াও, দলবিরোধী কার্যকলাপের জন্য কয়েকজনকে দল থেকে বহিষ্কার করা হচ্ছে।
দুই বিধায়ককে বহিষ্কার করলেও খাতায় কলমে এখন তৃণমূলের বিধায়ক সংখ্যা ৮০। ফলে ঋতব্রত এবং সন্দীপনকে ঘিরে যদি তৃণমূলে বিদ্রোহী বিধায়কের সংখ্যা বাড়তে থাকে, তাহলে দলের প্রতীকও হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে।
আইন বলছে, ঋতব্রত এবং সন্দীপন যদি দুই তৃতীয়াংশের বেশি তৃণমূল বিধায়কের (৫৩ জন বিধায়কের) সমর্থন নিজেদের দিকে টানতে পারেন, সেক্ষেত্রে তাঁরা দলত্যাগ বিরোধী আইনের কোপে পড়বেন না বরং তাঁরা তখন তৃণমূলের জোড়াফুল প্রতীকেরও দাবী জানাতে পারবেন। ঠিক যেমনটা হয়েছিল মহারাষ্ট্রে শিবসেনা এবং এনসিপি-র ক্ষেত্রে। সেই সম্ভাবনার কথা একেবারে উড়িয়ে দেননি ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। উলুবেড়িয়ার পূর্বের বিধায়ক বরং ইঙ্গিতপূর্ণ ভাবে বলেন, কালকে কী হবে বলতে পারব না। বেঁচে থাকে কি না গ্যারান্টি আছে। তবে একটা ভরসা আছে, জনগণ বাঁচাবে।"
এদিকে দলের অন্দরে ওঠা এই ঝড়ের জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর নিজের দলের একটি গোষ্ঠীর পাশাপাশি বিজেপিকেও দায়ী করেছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন যে, বিজেপি ভয়ভীতি ও ঘুষের মাধ্যমে তৃণমূল বিধায়ক ও সাংসদদের দলে টানার চেষ্টা করছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন যে বিজেপি পুলিশের অপব্যবহার করছে এবং তাঁর দলের কিছু নেতা বিদ্রোহীদের মতো আচরণ করছেন।
ফেসবুক লাইভ ভিডিওতে সোমবার বিজেপি সরকারকে নিশানা করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি দাবী করেছেন, "চারজন বিধায়ক আমার কাছে অভিযোগ নিয়ে এসেছিলেন যে পুলিশ তাঁদের ভয় দেখাচ্ছে। তাঁদের এও বলা হয়েছিল যে সভায় যোগ দিলে অস্ত্র আইনে গ্রেফতার করা হবে। এটা কেমন গণতন্ত্র? এই রাজ্যে নিপীড়ন সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে।"
এর আগে, রবিবার কালীঘাটে অনুষ্ঠিত একটি সভায় তৃণমূলের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে অন্তত ৬০ জন অনুপস্থিত ছিলেন। সূত্রের বরাত দিয়ে এনডিটিভি জানিয়েছে যে, ঠিক সেই সময়ে কিছু বিধায়ক রথিন ঘোষের বাড়িতে জড়ো হয়েছিলেন। মমতার সভায় যোগ না দেওয়া বিধায়কদের মধ্যে রথীনও ছিলেন। তিনি বলেন, "আমার শরীর ভালো ছিল না, তাই সভায় যোগ দিতে পারিনি।"
উল্লেখ্য, ২০২২ সালে রাজনৈতিক ডামাডোল তৈরি হয় মহারাষ্ট্রে। এনসিপি-র পর ভাঙন ধরে শিবসেনায়। একনাথ শিন্ডে ৪০ জন বিধায়ক নিয়ে গুয়াহাটির হোটেলে চলে যান। বিজেপি-কে সমর্থন করেন তিনি। শিন্ডে গোষ্ঠী শিবসেনা বিধায়কদের সমর্থনে মহারাষ্ট্রে সরকার গড়ে বিজেপি। নির্বাচন কমিশনের কাছে শিবসেনার প্রতীকও দাবী করেন। নির্বাচন কমিশন সেই আর্জিতে অনুমোদনও দেয়। কারণ শিবসেনার দুই তৃতীয়াংশের বেশি বিধায়কের সমর্থন ছিল শিন্ডের পক্ষে। শেষ পর্যন্ত শিবসেনার প্রতীক পেয়ে যান একনাথ শিন্ডে। একই ভাবে দলের প্রতীক হারিয়েছিলেন শরদ পাওয়ারও। সেই প্রতীক পান উদ্ধব ঠাকরে। এবারে বাংলায় জোড়াফুল প্রতীকের ভবিষ্যৎ কী হতে চলেছে, তার উত্তর সময়ের অপেক্ষা।

No comments:
Post a Comment