কলকাতা: তৃণমূল সুপ্রিমোর ডাকা বৈঠকে আরও কমল বিধায়কের সংখ্যা। বিধানসভা নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয়ের পর থেকেই একের পর এক ধাক্কা তৃণমূল কংগ্রেস মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। শুক্রবার ডাকা বিধায়ক ও সাংসদদের বৈঠকে মাত্র আটজন বিধায়ক ও ছয়জন সাংসদ উপস্থিত ছিলেন। গত বৈঠকে ২০ জন বিধায়ক উপস্থিত ছিলেন। এবার এই সংখ্যা আরও কমল। উল্লেখ্য, তৃণমূলের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৫৮ জন বিদ্রোহ করে নতুন বিরোধী দলনেতা নির্বাচিত করেছেন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালীঘাটের বাড়িতে বিধায়ক ও সাংসদদের একটি বৈঠক ডাকা হয় এদিন। বৈঠকে উপস্থিত বিধায়কদের মধ্যে ছিলেন বীণা মণ্ডল, অসীমা পাত্র, মদন মিত্র, কুণাল ঘোষ, ফিরহাদ হাকিম, শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অশোক কুমার দেব। অন্যদিকে সাংসদদের মধ্যে ছিলেন দোলা সেন, মালা রায়, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, ডেরেক ও'ব্রায়েন এবং সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। এছাড়াও দলের পুরনো কিছু মুখকে এদিনের বৈঠকে উপস্থিত থাকতে দেখা যায়। বিদ্রোহী বিধায়কদের কাউকেই এদিন দেখা যায়নি। বলা ভালো, এদিনের বৈঠক ছিল 'পুরনো তৃণমূল'-এর সমাবেশ।
একদিকে যেখানে বিদ্রোহী বিধায়করা জোট বাঁধছেন অন্যদিকে লোকসভার রাশও মমতার হাতছাড়া হতে পারে বলে জোর জল্পনা চলছে। লোকসভা সাংসদদের মধ্যেও বড়সড় ভাঙনের ইঙ্গিত মিলছে। সূত্রে জানা যাচ্ছে, ২৯ জন লোকসভা সাংসদের মধ্যে ২৩ জনই বিদ্রোহী বিধায়কদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। এদিকে দলত্যাগ বিরোধী আইন অনুযায়ী দুই-তৃতীয়াংশ আসনের প্রয়োজন, যা ২২ জন। রাজ্যসভায় দলটির ১৩ জন সাংসদ রয়েছেন।
১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে তৃণমূল কংগ্রেস নিজের ২৮ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে এসে তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করেন। তৃণমূল কংগ্রেসের এই সংকট কেবল ক্ষমতা হারানোর বিষয় নয় বরং নেতৃত্বের নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। অসন্তুষ্ট বিধায়করা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্ব মেনে নিলেও, মমতার ভাইপো এবং তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী হিসেবে বিবেচিত অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য তাঁদের বিরোধিতা করতে দেখা যাচ্ছে। নতুন বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় তো জানিয়েই দিয়েছেন তাদের পরিষদীয় দলের সঙ্গে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দূরদূরান্তের কোনও সম্পর্ক নেই।
এদিকে দলের প্রবীণ সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন যে, যাঁরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ছেড়ে যাচ্ছেন, তাঁকে ছাড়া তাঁদের কোনও রাজনৈতিক অস্তিত্ব নেই। রাজ্যসভার প্রবীণ সাংসদ সুখেন্দু শেখর রায় যদিও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে, অসন্তোষের এই আবহ সংসদেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। যদিও দলের নেতৃত্ব দাবী করছে যে, সাংসদদের মধ্যে কোনও সংগঠিত বিদ্রোহের লক্ষণ নেই, তবে আশঙ্কা বাড়ছে যে বিধানসভার ঘটনার পুনরাবৃত্তি লোকসভা ও রাজ্যসভাতেও ঘটতে পারে।
এমতাবস্থায় দলের এই ভাঙন ঠেকাতে ময়দানে নেমেছেন তৃণমূল কংগ্রেস সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই। তিনি ব্যক্তিগতভাবে বিদ্রোহী বিধায়কদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন, অন্যদিকে দলের শীর্ষ নেতারা অন্য বিধায়কদের ঐক্যবদ্ধ রাখতে কাজ করছেন। দলীয় সূত্র জানিয়েছে, গত দুদিনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হাওড়া, মুর্শিদাবাদ ও উত্তর দিনাজপুরের বেশ কয়েকজন বিধায়কের সঙ্গে কথা বলেছেন, যাঁদের মধ্যে অনেককেই ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী শিবিরের সভায় যোগ দিতে দেখা গিয়েছিল।
কিন্তু এতসবের মাঝেও যে প্রশ্ন উঠছে পুরনোদের ভরসার হাতে ভর করে কী তৃণমূল সুপ্রিমো দলের সংগঠন মজবুত করতে পারবে? নাকি বিদ্রোহীদের চ্যালেঞ্জ আরও কঠিন পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেবে? উত্তরের অপেক্ষায় রাজনৈতিক মহল।

No comments:
Post a Comment