ডায়াবেটিস বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম সাধারণ দীর্ঘস্থায়ী রোগ। শুধু ওষুধ খাওয়া বা খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করলেই এই রোগ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় না। নিয়মিত শরীরচর্চাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশেষ করে পায়ের ব্যায়াম বা লেগ এক্সারসাইজ ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট ডা. জয়াদিত্য ঘোষের মতে, আমাদের শরীরের সবচেয়ে বড় পেশিগুলির মধ্যে পায়ের পেশি অন্যতম। এই পেশিগুলি সক্রিয় থাকলে শরীর বেশি পরিমাণে গ্লুকোজ ব্যবহার করে, ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য হয়। পাশাপাশি ইনসুলিন আরও কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে।
পায়ের ব্যায়ামের প্রধান উপকারিতা
রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক
স্কোয়াট, লাঞ্জ, দ্রুত হাঁটা, সাইক্লিং বা অন্যান্য পায়ের ব্যায়াম করার সময় পায়ের পেশি বেশি শক্তি ব্যবহার করে। এই শক্তির প্রধান উৎস হলো রক্তে থাকা গ্লুকোজ। ফলে অতিরিক্ত গ্লুকোজ খরচ হয় এবং রক্তে শর্করার মাত্রা কমাতে সাহায্য করে।
ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়ায়
অনেক ডায়াবেটিস রোগীর শরীরে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স থাকে। অর্থাৎ শরীরের কোষ ইনসুলিনের প্রতি ঠিকমতো সাড়া দেয় না। নিয়মিত পায়ের ব্যায়াম করলে ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বাড়তে পারে। এতে শরীর সহজে গ্লুকোজ গ্রহণ করতে পারে এবং রক্তে শর্করার ওঠানামা কম হয়।
রক্ত সঞ্চালন উন্নত করে
ডায়াবেটিসের কারণে অনেকের পায়ে রক্ত চলাচল কমে যায়। এর ফলে পা অবশ হয়ে যাওয়া, ঝিনঝিনি অনুভব করা বা ক্ষত শুকাতে দেরি হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়। নিয়মিত ব্যায়াম করলে পায়ের রক্ত সঞ্চালন ভালো থাকে, যা ডায়াবেটিক ফুটের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।
ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে
পায়ের পেশি শরীরের সবচেয়ে বড় পেশিগুলির মধ্যে হওয়ায় এগুলো সক্রিয় থাকলে বেশি ক্যালোরি খরচ হয়। ফলে ওজন নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়। ওজন কম থাকলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করাও তুলনামূলক সহজ হয়।
হৃদ্যন্ত্র সুস্থ রাখে
নিয়মিত লেগ এক্সারসাইজ হৃদ্যন্ত্রের কর্মক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। পাশাপাশি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং কোলেস্টেরলের মাত্রা স্বাভাবিক রাখতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
ডায়াবেটিস রোগীরা কোন কোন ব্যায়াম করতে পারেন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী নিচের ব্যায়ামগুলো করা যেতে পারে—
দ্রুত হাঁটা
স্কোয়াট
লাঞ্জ
স্টেপ-আপ
সাইক্লিং
হালকা রেজিস্ট্যান্স ট্রেনিং
তবে যাঁদের ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথি, জয়েন্টের ব্যথা বা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যা রয়েছে, তাঁদের নতুন ব্যায়াম শুরু করার আগে অবশ্যই চিকিৎসক বা ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ব্যায়ামের সময় যেসব বিষয় মাথায় রাখবেন
ব্যায়ামের আগে ও পরে রক্তে শর্করার মাত্রা পর্যবেক্ষণ করুন।
আরামদায়ক ও সঠিক মাপের জুতো পরুন।
প্রতিদিন পা পরীক্ষা করুন, কোনো ক্ষত বা ফোস্কা আছে কি না দেখুন।
ধীরে ধীরে ব্যায়ামের সময় ও তীব্রতা বাড়ান।
পর্যাপ্ত জল পান করুন এবং শরীরকে পানিশূন্য হতে দেবেন না।
উপসংহার
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে শুধু ওষুধ বা খাদ্যাভ্যাস যথেষ্ট নয়। নিয়মিত পায়ের ব্যায়াম করলে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ, ইনসুলিনের কার্যকারিতা বৃদ্ধি, রক্ত সঞ্চালন উন্নত হওয়া, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং হৃদ্যন্ত্র সুস্থ রাখতে উল্লেখযোগ্য উপকার পাওয়া যায়। তবে প্রতিটি রোগীর শারীরিক অবস্থা আলাদা, তাই নতুন কোনো ব্যায়াম শুরু করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।

No comments:
Post a Comment