তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্য সভাপতির পদ থেকে চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের পদত্যাগকে কেন্দ্র করে রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে নতুন করে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। দলের সাংগঠনিক ভবিষ্যৎ, নেতৃত্বের ভূমিকা এবং অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ—সবকিছু নিয়েই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। চন্দ্রিমার ইস্তফার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রকাশ্যে তাঁর ভূমিকার সমালোচনা করেন দলের বর্ষীয়ান সাংসদ সৌগত রায়। তাঁর বক্তব্য, রাজ্য সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনে চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য সফল হননি বলেই দলের ভিতরে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল।
সৌগত রায়ের দাবি, দলীয় কার্যালয় দখলকে ঘিরে যে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, সেই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে রাজ্য সভাপতির সক্রিয় ভূমিকা দেখা যায়নি। তাঁর কথায়, একজন রাজ্য সভাপতির কাছ থেকে যে ধরনের নেতৃত্ব প্রত্যাশিত, সেই দায়িত্ব পালন করতে পারেননি চন্দ্রিমা। তিনি আরও বলেন, পদত্যাগের সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে চন্দ্রিমার নিজের এবং তাঁকে সেই সিদ্ধান্ত থেকে বিরত রাখার কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
সৌগত রায় আরও দাবি করেন, দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বারবার চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের প্রতি আস্থা দেখিয়েছেন। নির্বাচনে পরাজয়ের পরও তাঁকে অন্য কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয় এবং পরে গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক দায়িত্বও তুলে দেওয়া হয়। কিন্তু সেই আস্থার প্রতিদান তিনি দিতে পারেননি বলেই তাঁর অভিযোগ। সাম্প্রতিক সময়ে চন্দ্রিমা যে অভিযোগগুলি প্রকাশ্যে তুলেছেন, সেগুলির গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর থেকেই তৃণমূল কংগ্রেসের ভিতরে অসন্তোষ ও মতভেদের খবর সামনে আসতে থাকে। সংগঠনের উপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে দলীয় নেতৃত্ব সমস্ত সাংগঠনিক কমিটি ভেঙে নতুনভাবে সংগঠন গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয়। একই সময়ে কয়েকজন সাংসদ অন্য একটি রাজনৈতিক দলে যোগ দেন। আবার দলের একাংশ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে সমর্থন জানিয়ে আলাদা বিধায়ক গোষ্ঠী গঠন করে। এই পরিস্থিতিতে কালীঘাটে বৈঠক ডেকে সংগঠন পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং সেই বৈঠকেই চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যকে রাজ্য সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়।
অসুস্থতার কারণে সুব্রত বক্সি দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর পর তাঁর জায়গায় দায়িত্বভার গ্রহণ করেন চন্দ্রিমা। তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে দলের একাংশের মধ্যে শুরু থেকেই আপত্তি ছিল বলে দলীয় সূত্রের দাবি। কয়েকজন প্রবীণ নেতা মনে করেছিলেন, নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর রাজ্য সংগঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া যথাযথ সিদ্ধান্ত ছিল না। পাশাপাশি জেলার সাংগঠনিক কাঠামো সম্পর্কে পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতার অভাব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল।
দায়িত্ব গ্রহণের পর চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যকে তুলনামূলকভাবে কম সাংগঠনিক কর্মসূচিতে দেখা গিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও সম্প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে তিনি উপস্থিত ছিলেন, তার কিছুদিনের মধ্যেই তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন।
এরই মধ্যে তাঁর ছেলেকে ঘিরেও রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়। একসময় কাউন্সিলর থাকা তাঁর ছেলে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের একটি বৈঠকে যোগ দেওয়ায় রাজনৈতিক মহলে নানা জল্পনা শুরু হয়। পরে চন্দ্রিমা জানান, তিনি ছেলেকে ওই বৈঠকে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর কথা শোনা হয়নি।
শনিবার সকালে চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য আনুষ্ঠানিকভাবে রাজ্য সভাপতির পদ থেকে ইস্তফা দেন। দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্দেশে পাঠানো পদত্যাগপত্রে তিনি জানান, রাজ্য সভাপতির দায়িত্বের পাশাপাশি দলের এবং বিভিন্ন শাখা সংগঠনের ব্যাঙ্ক হিসাব পরিচালনায় তাঁর স্বাক্ষরের অধিকারও তিনি প্রত্যাহার করে নিচ্ছেন। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের কাছে দলের অনুমোদিত প্রতিনিধি হিসেবে তাঁর উপর ন্যস্ত দায়িত্ব থেকেও অব্যাহতি নেওয়ার কথা উল্লেখ করেন।
পদত্যাগের পর সংবাদমাধ্যমের সামনে এসে চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য নিজের সিদ্ধান্তের পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করেন। সেই সময় তিনি দলীয় নেতৃত্ব, বিশেষ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাঁর এই মন্তব্যের পর রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, রাজ্যে ক্ষমতা হারানোর পর তৃণমূল কংগ্রেসের সাংগঠনিক পুনর্গঠন এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। নেতৃত্বের পরিবর্তন, দলত্যাগ, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব এবং সাম্প্রতিক পদত্যাগ—সব মিলিয়ে দলের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। এখন রাজ্য সভাপতির পদে কাকে দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং দলীয় নেতৃত্ব কীভাবে এই পরিস্থিতি সামাল দেয়, সেদিকেই নজর থাকবে রাজ্যের রাজনৈতিক মহলের।

No comments:
Post a Comment