একুশে জুলাইয়ের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে এ বছর রাজ্যের রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে নতুন সমীকরণ। দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূল কংগ্রেসের একক কর্মসূচি হিসেবে পরিচিত এই দিনেই এবার পৃথক সমাবেশের আয়োজন করে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন শিবির। মেয়ো রোডে গান্ধী মূর্তির পাদদেশে আয়োজিত ওই সভা থেকে দলের বর্তমান নেতৃত্বের বিরুদ্ধে একাধিক রাজনৈতিক অভিযোগ তোলেন তিনি।
ভাষণের শুরুতেই একুশে জুলাইয়ের প্রচলিত আয়োজনের ধরন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন ঋতব্রত। নাম না করেই কালীঘাট শিবিরকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, শহিদ দিবস কোনও বিনোদনের অনুষ্ঠান নয় এবং এটি কখনও তারকাদের উপস্থিতি দিয়ে সাজানোর বিষয় হতে পারে না। তাঁর অভিযোগ, বহু বছর ধরে প্রকৃত সংগঠনের কর্মীদের গুরুত্ব না দিয়ে মঞ্চে বেশি জায়গা দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন বিনোদন জগতের পরিচিত মুখদের। ফলে দীর্ঘদিন ধরে দলের জন্য কাজ করা নেতা-কর্মীরা উপযুক্ত মর্যাদা পাননি।
তিনি দাবি করেন, যাঁরা রাজনৈতিক আন্দোলনের সময় মামলা মোকাবিলা করেছেন, আর্থিক কষ্ট সহ্য করেছেন এবং সংগঠনকে শক্তিশালী করতে নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পত্তিও বিক্রি করেছেন, তাঁদের অবদানকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। তাঁর মতে, শহিদ দিবসের মঞ্চে প্রকৃত সংগ্রামী কর্মী ও শহিদ পরিবারের সদস্যদেরই অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত।
সভা থেকে ঋতব্রত অভিযোগ করেন, তাঁদের কর্মসূচিতে যোগ দিতে আসা সমর্থকদের বিভিন্ন জায়গায় বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। তাঁর দাবি, কয়েকটি এলাকায় ভয় দেখিয়ে অনেককে সভায় আসতে বাধা দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে মহেশতলা এলাকায় তাঁদের সমর্থকদের বহনকারী একটি বাস আটকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও তোলেন তিনি। এই ঘটনার বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হবে বলেও জানান। পাশাপাশি তাঁর হুঁশিয়ারি, ভয় দেখিয়ে বা চাপ সৃষ্টি করে তাঁদের রাজনৈতিক কর্মসূচি বন্ধ করা যাবে না।
রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে উদ্দেশ্য করেও একাধিক প্রশ্ন তোলেন ঋতব্রত। তিনি জানতে চান, উনিশশো তিরানব্বই সালের একুশে জুলাইয়ের ঘটনার তদন্তে গঠিত কমিশনের পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট এখনও পর্যন্ত জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি কেন। তাঁর মতে, শহিদদের প্রতি প্রকৃত সম্মান জানাতে হলে সেই তদন্তের ফলাফল মানুষের সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন।
দলের আর্থিক স্বচ্ছতার বিষয়েও সরব হন তিনি। ঋতব্রতের দাবি, দলের আয়-ব্যয়ের সম্পূর্ণ হিসাব প্রকাশ করে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করা উচিত। তাঁর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে দলীয় তহবিলের ব্যবহারে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেন, ভবিষ্যতে তাঁদের হাতে দলীয় আর্থিক দায়িত্ব এলে একুশে জুলাইয়ের প্রত্যেক শহিদ পরিবারের জন্য মাসিক আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে।
এদিনের সভায় উপস্থিত নেতারা দাবি করেন, তাঁদের লক্ষ্য কোনও ব্যক্তিকে আক্রমণ করা নয়, বরং একুশে জুলাইয়ের মূল রাজনৈতিক চেতনা ও শহিদদের আত্মত্যাগের ইতিহাসকে সামনে আনা। তাঁদের বক্তব্য, এই কর্মসূচিতে তারকা সংস্কৃতির পরিবর্তে সংগঠনের কর্মী, আন্দোলনের সৈনিক এবং শহিদ পরিবারের সদস্যদের যথাযথ মর্যাদা দেওয়া প্রয়োজন।
প্রসঙ্গত, একুশে জুলাই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। উনিশশো তিরানব্বই সালে যুব কংগ্রেসের ডাকা কর্মসূচির সময় পুলিশের গুলিতে তেরো জনের মৃত্যু হয়েছিল। সেই ঘটনার স্মরণে পরবর্তী সময়ে এই দিনটি শহিদ দিবস হিসেবে পালন করা হয়। বহু বছর ধরে এই কর্মসূচি তৃণমূল কংগ্রেসের অন্যতম বৃহত্তম রাজনৈতিক সমাবেশ হিসেবে পরিচিত। তবে দলীয় বিভাজনের পর এবার প্রথমবার একই দিনে পৃথক দুটি মঞ্চে কর্মসূচি হওয়ায় রাজনৈতিক মহলে বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
মেয়ো রোডের সভা থেকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের ধারাবাহিক বক্তব্য স্পষ্ট করে দিয়েছে, আগামী দিনে রাজ্যের রাজনীতিতে একুশে জুলাইয়ের তাৎপর্য শুধুমাত্র স্মরণসভায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং দলীয় অবস্থান, নেতৃত্বের ভূমিকা এবং রাজনৈতিক আদর্শ নিয়েও নতুন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতে পারে।

No comments:
Post a Comment