কলকাতা: দলীয় প্রতীক, তহবিল হাতছাড়া হওয়ার পথে। শুক্র সন্ধ্যায় দখল হয়ে গিয়েছে দলীয় কার্যালয়, এরই মাঝে মমতা শিবিরে জোর ধাক্কা। এবারে তৃণমূলের পদ ছাড়লেন চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। তৃণমূলের রাজ্য সভানেত্রীর পদ ছাড়লেন চন্দ্রিমা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দিয়েছেন তিনি। এমনই তৃণমূলের সমস্ত পদ থেকেও ইস্তফা দিয়েছেন চন্দ্রিমা। এতে করে মমতা-শিবিরের ভাঙন যেন আরও ফুটে উঠল।
চিঠি দিয়ে তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে চন্দ্রিমা জানিয়েছেন, গত ৩ জুন তাঁকে যে পদে বসানো হয়েছিল, তা থেকে তিনি সরে দাঁড়াচ্ছেন। তৃণমূল এবং তার বিভিন্ন শাখা সংগঠনের বিভিন্ন ব্যাঙ্কে যে অ্যাকাউন্ট রয়েছে, তার সিগনেটরির দায়িত্ব থেকেও অব্যাহতি চেয়েছেন চন্দ্রিমা। নির্বাচন কমিশনে তৃণমূলের প্রতিনিধিত্ব করার দায়িত্ব ছিল তাঁর। সেই দায়িত্বও ছাড়লেন রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী। শনিবারই মমতাকে চিঠি দিয়েছেন চন্দ্রিমা।
সম্প্রতি নতুন তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন চন্দ্রিমার পুত্র সৌরভ বসু। তার পরেই তৈরি হয়েছিল জল্পনা। প্রশ্ন উঠেছিল, ছেলে যেখানে বিরোধী শিবিরে নাম লেখান, মা সেখানে মমতার তৃণমূল শিবিরে আর কত দিন? সেই জল্পনাতেই যেন এদিন সিলমোহর পড়ল।
উল্লেখ্য, একমাস আগেই দলের সমস্ত পুরোনো কমিটি ভেঙে নতুন করে সংগঠন সাজান তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কালীঘাটে জাতীয় ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক শেষে সুব্রত বক্সির জায়গায় নতুন রাজ্য সভাপতি করা হয় চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যকে। নির্বাচনে ভরাডুবির পর ফিরহাদ হাকিম, অরূপ রায়, অরূপ বিশ্বাসের মতো অনেক সহযোদ্ধারাই মুখ ফিরিয়ে নিলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রায় সব কর্মসূচিতেই দেখা যাচ্ছিল চন্দ্রিমাকে। এবার সেই নেত্রীও ইস্তফা দিলেন।
জানা গিয়েছে, গত ৩ জুন রাজ্য সভানেত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে প্রায় প্রত্যেকদিনই নিয়ম করে মেট্রোপলিটানে তৃণমূলের পার্টি অফিসে যেতেন চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। শুক্রবারও তিনি গিয়েছিলেন। এমনকি চন্দ্রিমার উপস্থিতিতেই তৃণমূলের ঋতব্রত ভট্টাচার্যরা ওই পার্টি অফিসে ঢোকেন। এরপরই চন্দ্রিমা পার্টি অফিস ছাড়েন।
সূত্রের খবর, ওই ঘটনার পরই চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের প্রতি সন্দেহ প্রকাশ করেন মমতা। ঘনিষ্ঠ মহলে মমতা দাবী করেন, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের ষড়যন্ত্রেই তৃণমূল ভবন ঋতব্রত শিবিরের হাতে গিয়েছে। এতেই দলনেত্রীর প্রতি অসন্তুষ্ট চন্দ্রিমা। তারপরই দলের সব পদ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
এদিন এক সংবাদমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে চন্দ্রিমা বলেন, "আমি দীর্ঘদিনের সৈনিক হিসাবে কাজ করার চেষ্টা করেছি। সংগঠনকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করেছি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি শ্রদ্ধা রয়েছে। ৩ জুন কালীঘাটের বৈঠকে এই রাজ্যের সভানেত্রী হিসাবে নিযুক্ত করেন। আমি সেদিন থেকে একটি দিনও হয়নি যেদিন আমি মেট্রোপলিটানের অফিসে যাইনি। গত ২২ জুন এবং ১ জুলাই ছাড়া রোজ গিয়েছি। আমার সহকর্মীরা স্বীকার করবেন সেকথা।"
তৃণমূল ভবন দখলের প্রসঙ্গ টেনে চন্দ্রিমা আরও বলেন, "গতকাল একটা ঘটনা হয়েছে যা সকলের জানা। বেশ কয়েকজন বিধায়ক গিয়েছিলেন। আমি যতক্ষণ ছিলাম ওই বিধায়করা আমার সঙ্গে কথা বলেননি। আমি বাড়ি চলে আসার পর মমতা দি ফোন করতে বলেন। ফোন করলে বলেন, তুমি ওদের হাতে ভবন তুলে দিলে! আমার এত দুঃখ হয়েছে। আমি বললাম দিদি আপনি আমাকে এই কথা বলতে পারলেন? সেই কারণে আমি মনে করলাম আমার আনুগত্যে প্রশ্নচিহ্নে থেকে যাচ্ছে। আমি মনে করি এই পরিস্থিতিতে আর আমার কাজ করা উচিৎ নয়।"
অভিমানী চন্দ্রিমার দাবী, 'আমার আনুগত্যে কোনও খামতি নেই। বেদনাহত মন নিয়ে আমি ছেড়ে দিলাম।" কালীঘাটে আর যাওয়ার প্রশ্নই আসে না বলেও জানান প্রাক্তন মন্ত্রী।
উল্লেখ্য, মমতার মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ছিলেন চন্দ্রিমা। অর্থ এবং স্বাস্থ্য- রাজ্যের এই দুই গুরুত্বপূর্ণ দফতরে মমতা মন্ত্রী থাকলেও প্রতিমন্ত্রীর পদে ছিলেন চন্দ্রিমা। এমনকি দলের মুষলপর্বেও চন্দ্রিমাকেই রাজ্য সভাপতির পদে বসিয়েছিলেন তৃণমূল সুপ্রিমো। কিন্তু সেই চন্দ্রিমাই আজ সরে দাঁড়ালেন।

No comments:
Post a Comment