'আমি আত্মহত্যা করে নিব', মনমোহন সিং কেন একথা বলেছিলেন প্রাক্তন প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে? - Press Card News

Breaking

Post Top Ad

Post Top Ad

Sunday, July 12, 2026

'আমি আত্মহত্যা করে নিব', মনমোহন সিং কেন একথা বলেছিলেন প্রাক্তন প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে?


ন্যাশনাল ডেস্ক, ১২ জুলাই ২০২৬: 'আমি আত্মহত্যা করে নিব', এই কথা ২০১২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং তৎকালীন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এস ওয়াই কুরেশিকে বলেছিলেন। যখন নির্বাচন কমিশনের কাজকর্ম নিয়ে কিছু মন্ত্রীর করা অযৌক্তিক মন্তব্যে আহত হয়ে কুরেশি তাঁর ক্ষোভ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পৌঁছে দিয়েছিলেন। মনমোহন সিং, কুরেশিকে এও বলেছিলেন যে, নির্বাচন কমিশন শুধু ভারতের গর্বই নয়, এটি দেশের গণতন্ত্রের আত্মা, আর যদি আমরা একে হারাই, তবে আমরা সবকিছু হারিয়ে ফেলব। এই আকর্ষণীয় কথোপকথনটির বর্ণনা কুরেশি করেছেন তাঁর আসন্ন বই 'ইন্ডিয়া অ্যান্ড আই: এ হান্ড্রেড মেমোরিজ, নট এ মেমোয়ার'-এ। 


তাঁর বইতে, প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার মনমোহন সিংকে এমন একজন নেতা হিসেবে স্মরণ করেছেন, যাঁর কাছে সাংবিধানিক শিষ্টাচার কেবল বক্তৃতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না বরং তাঁর আচরণ ও চিন্তাভাবনার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। কুরেশির মতে, ২০১২ সালের জানুয়ারিতে উত্তর প্রদেশে নির্বাচন চলছিল। সেই সময় আইনমন্ত্রী সালমান খুরশিদ একটি নির্বাচনী সমাবেশে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, তাঁর দল ক্ষমতায় এলে চাকরিতে মুসলিমদের জন্য সংরক্ষণ ৪.৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৯ শতাংশ করা হবে।


হ্যাশেট ইন্ডিয়া থেকে প্রকাশিত এবং শীঘ্রই বাজারে আসা বইতে কুরেশি লেখেন, "ভারতীয় জনতা পার্টি এটিকে আদর্শ আচরণবিধির লঙ্ঘন বলে অভিহিত করে এবং অবিলম্বে নির্বাচন কমিশনের কাছে অভিযোগ করে যে, নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর এবং আদর্শ আচরণবিধি কার্যকর থাকা অবস্থায় কোনও নতুন প্রকল্প ঘোষণা করা যায় না। আমরা চার দিনব্যাপী শুনানি করেছিলাম। কংগ্রেসের পক্ষে অভিষেক মনু সিংভি এবং বিজেপির পক্ষে অরুণ জেটলি যুক্তি উপস্থাপন করেন। দুজন বিশিষ্ট আইনজ্ঞ একটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি এবং ভোটারদের প্রলুব্ধ করার মধ্যে কোথায় সীমারেখা টানতে হবে, এই জটিল প্রশ্ন নিয়ে তীব্র বিতর্কে লিপ্ত ছিলেন। অবশেষে, নির্বাচন কমিশন খুরশিদের নিন্দা করে।" কুরেশির মতে, আদর্শ আচরণবিধির অধীনে কমিশনের কাছে উপলব্ধ এটিই ছিল সবচেয়ে কঠোর ব্যবস্থা।


কুরেশি, ২০১০ সালের জুলাই থেকে ২০১২ সালের জুন পর্যন্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বলেন যে, কমিশনের পদক্ষেপে খুরশিদ স্পষ্টতই ক্ষুব্ধ ছিলেন। এর পরে, কংগ্রেসের মধ্যে এই কথা উঠতে শুরু করে যে নির্বাচন কমিশন অহংকারী বা স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠেছে। কুরেশি তাঁর বইতে লিখেছেন, "সমালোচনা আমাকে কখনও বিচলিত করে না, কিন্তু প্রচ্ছন্ন মন্তব্য যাতে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষুণ্ণ হয়, তা করে। এই ধরণের অযৌক্তিক মন্তব্য স্বীকার্য ছিল না।" এই সময়ে, কুরেশি ঈদ উপলক্ষে তাঁর বাড়িতে বার্ষিক মিলনমেলার আয়োজন করেন। অতিথিদের মধ্যে ছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব হরিশ খারে। কথোপকথনের সময় কুরেশি তাঁর অসন্তোষের প্রকাশ করেন। হরিশ খারে জিজ্ঞাসা করেন, "আমি কি প্রধানমন্ত্রীকে বলব?" কুরেশি উত্তর দেন, "হ্যাঁ। আমি তো আপনাকে সেটাই বলতে বলছি।"


পরের দিন, কুরেশির আরএএক্স ( রেস্ট্রিকটেড অ্যাকসেস এক্সচেঞ্জ) ফোন বেজে ওঠে। অপর প্রাক্ত থেকে বলা হয়, "প্রধানমন্ত্রী আপনার সাথে জরুরিভিত্তিতে কথা বলতে চান।" কিছুক্ষণ পরেই মনমোহন সিং ফোনে এলেন। তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল উদ্বিগ্ন। তিনি বললেন, "কুরেশি জি, আমি কি এখনই আপনার সঙ্গে দেখা করতে পারি?" কুরেশির ভাষ্যমতে, সিং-এর বলার ভঙ্গিমা শুনে মনে হচ্ছিল তিনি নিজেই তাঁর সঙ্গে দেখা করতে প্রস্তুত। তিনি উত্তর দিলেন, "স্যার, আপনি প্রধানমন্ত্রী। আপনি যখন বলবেন, আমি তখনই আসব।" সন্ধ্যা ৭টায় সাক্ষাতের সময় নির্ধারিত হয়। সেই সন্ধ্যায় কুরেশি প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে পৌঁছন।


এস ওয়াই কুরেশি বলেন, "মনমোহন সিং দরজার কাছে অপেক্ষা করছিলেন। তিনি আমাকে ভেতরে নিয়ে গেলেন এবং আমরা ঠিকমতো বসার আগেই, সিং অত্যন্ত ব্যথিত স্বরে বলেন, ‘আপনি যা বলেছেন, হরিশ আমাকে তা বলেছে। আপনি যদি এমনটা ভেবে থাকেন, তাহলে আমি আত্মহত্যা করে নিব'।" প্রাক্তন প্রধান নির্বাচন কমিশনার লিখেছেন যে, এই কথা শুনে তিনি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর অভিযোগ ছিল কিছু মন্ত্রীর আচরণ নিয়ে, মনমোহন সিংকে নিয়ে নয়। কুরেশির মতে, সিং সবসময় নির্বাচন কমিশনকে ভারতের গর্ব এবং দেশের সফট পাওয়ার হিসেবে বর্ণনা করতেন। তাঁর জন্য এটা কল্পনা করাও অসহনীয় ছিল যে, কুরেশির তাঁর উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ হতে পারে।


মনমোহন সিং তাঁকে বলেন, "আমি একদমই জানতাম না। আমি যদি জানতাম, তাহলে তাঁকে কঠোরভাবে তিরস্কার করতাম। আপনার যদি কখনও কিছু বলার থাকে, শুধু ফোন তুলুন এবং আমার সাথে কথা বলবেন।" এরপর সিং এমন কথা বলেছিলেন যা কুরেশি আজও ভুলতে পারেননি। সিং বলেছিলেন, "নির্বাচন কমিশন শুধু ভারতের গর্বই নয়, এটি আমাদের গণতন্ত্রের আত্মা। আমরা যদি একে হারাই, তাহলে আমরা সবকিছু হারিয়ে ফেলব।" প্রাক্তন প্রধান নির্বাচন কমিশনার লিখেছেন যে, এই সাক্ষাৎ তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। এর কারণ রাজনীতি ছিল না বরং তিনি এমন একজন নেতার মুখোমুখি হয়েছিলেন যাঁর কাছে সাংবিধানিক শিষ্টাচার নিছক একটি আনুষ্ঠানিকতা ছিল না বরং তাঁর আচরণ ও চিন্তাভাবনার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল।


কুরেশি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর প্রধান সচিব টি.কে.এ. নায়ার এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শিবশঙ্কর মেননকেও এই কথোপকথনের কথা জানিয়েছিলেন। হরিশ খারেও তাঁর বন্ধুদের কাছে বিষয়টি উল্লেখ করেছিলেন। প্রাক্তন প্রধান নির্বাচন কমিশনারের মতে, এই বৈঠকের পর নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে বাকবিতণ্ডা থেমে যায়। সংশ্লিষ্ট লোকেদের কাছে বার্তাটি নীরবে পৌঁছে গিয়েছিল এবং এর বেশি কিছু করার প্রয়োজন ছিল না। কুরেশি লিখেছেন, "আমি আমার জীবনে অনেক ক্ষমতাধর মানুষ দেখেছি কিন্তু খুব কম জনকেই দেখেছি যাঁরা এত সহজে ক্ষমতা গ্রহণ করেছেন এবং এর দায়িত্বের ভার এত গভীরভাবে অনুভব করেছেন।" তাঁর জীবনের ১০০টি আকর্ষণীয় ঘটনার এই সংকলনে, কুরেশি আমলাতন্ত্রে তাঁর দীর্ঘ যাত্রার সেইসব ঘটনা, দ্বিধা এবং অপ্রত্যাশিত কাহিনী লিপিবদ্ধ করেছেন, যা তাঁর কর্মজীবনকে রূপ দিয়েছে।

No comments:

Post a Comment

Post Top Ad