তিস্তা থেকে সিন্ধু—জলকে হাতিয়ার করে কি ভারতের বিরুদ্ধে নতুন কূটনৈতিক চাপ? - Press Card News

Breaking

Post Top Ad

Post Top Ad

Saturday, August 22, 2026

তিস্তা থেকে সিন্ধু—জলকে হাতিয়ার করে কি ভারতের বিরুদ্ধে নতুন কূটনৈতিক চাপ?


 তিস্তা থেকে সিন্ধু—জলবণ্টনকে কেন্দ্র করে ভারতের দুই প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান ও বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতায় যেন একই ধরনের কৌশলের ছাপ দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের জলসম্পদমন্ত্রী শাহিদ উদ্দিন চৌধুরী অ্যানি ভারতের সঙ্গে গঙ্গার জলবণ্টন চুক্তিতে ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ যুক্ত করার দাবি তুলেছেন। পাশাপাশি তিস্তা নদীর জলবণ্টন নিয়েও ভারতের কাছে দাবি জানিয়েছে ঢাকা। দাবি পূরণ না হলে রাষ্ট্রপুঞ্জ-সহ আন্তর্জাতিক মঞ্চে বিষয়টি তোলার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তিনি।

১৯ আগস্ট ঢাকায় একটি সেমিনারে বাংলাদেশের জলসম্পদমন্ত্রী বলেন, গঙ্গা জলবণ্টন চুক্তি পুনর্নবীকরণের সময় সেখানে অবশ্যই গ্যারান্টি ক্লজ রাখা প্রয়োজন। তাঁর দাবি, ১৯৭৭ সালের চুক্তিতে এই ধরনের একটি ধারা ছিল। কিন্তু ১৯৯৬ সালে হওয়া ৩০ বছরের গঙ্গা জলবণ্টন চুক্তিতে সেই ধারা রাখা হয়নি। বর্তমান চুক্তিটির মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বর মাসে শেষ হওয়ার কথা।

কী এই ‘গ্যারান্টি ক্লজ’?

মূলত শুষ্ক মরশুমে গঙ্গায় জলপ্রবাহ অত্যন্ত কমে গেলেও বাংলাদেশ যাতে একটি নির্দিষ্ট ন্যূনতম পরিমাণ জল পায়, সেই নিশ্চয়তাই চাইছে ঢাকা।

১৯৯৬ সালের চুক্তি অনুযায়ী, ফরাক্কা ব্যারাজে জলপ্রবাহ ৭০ হাজার কিউসেকের নীচে নেমে গেলে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে জল ভাগাভাগির নির্দিষ্ট ব্যবস্থা রয়েছে। বিশেষ করে ১১ মার্চ থেকে ১০ মে পর্যন্ত সময়টিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধরা হয়। এই সময়ে দু’দেশের মধ্যে পালা করে জল বণ্টনের ব্যবস্থা রয়েছে।

বাংলাদেশের মন্ত্রীর দাবি, জলপ্রবাহ আরও কমে গেলেও বাংলাদেশের জন্য একটি নির্দিষ্ট ন্যূনতম জল নিশ্চিত করতে হবে।

তিস্তা নিয়েও কড়া বার্তা ঢাকার

গঙ্গার পাশাপাশি তিস্তা জলবণ্টন নিয়েও বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন শাহিদ উদ্দিন। তিনি জানিয়েছেন, তিস্তা নিয়ে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক খারাপ করতে চায় না ঢাকা। তবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারিক রহমান তিস্তা প্রকল্পের বিষয়টি পর্যালোচনা করছেন এবং প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে—ভারতের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে হোক বা অন্য কোনও পরিকল্পনায়।

প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক মঞ্চে যাওয়ার কথাও জানিয়েছেন বাংলাদেশের জলসম্পদমন্ত্রী। তাঁর দাবি, আগামী মাসে রাষ্ট্রপুঞ্জে বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরতে পারেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।

রাষ্ট্রপুঞ্জের মঞ্চে যাওয়ার প্রস্তুতি কেন?

বাংলাদেশ ২০২৫ সালের জুনে ইউএনইসিই ওয়াটার কনভেনশনে স্বাক্ষর করেছে। ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এই কনভেনশনের সদস্য হয়েছে। এর মাধ্যমে জলসম্পদ নিয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং যৌথ ব্যবস্থাপনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তবে এই কনভেনশন কোনও আন্তর্জাতিক আদালত বা ট্রাইব্যুনাল নয়। ভারতও এর সদস্য নয়। ফলে এই মঞ্চ থেকে ভারতের উপর সরাসরি কোনও বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। তবুও নিজেদের দাবির পক্ষে আন্তর্জাতিক আইনি ও কূটনৈতিক ভিত্তি তৈরি করতে বাংলাদেশ এই প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

এর আগে একই পথে পাকিস্তান

জল নিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে যাওয়ার ক্ষেত্রে পাকিস্তানও সম্প্রতি একই ধরনের পদক্ষেপ করেছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে সিন্ধু জল চুক্তি স্থগিত রাখার ভারতের সিদ্ধান্ত নিয়ে ইসলামাবাদ রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদের দ্বারস্থ হয়েছিল। পাকিস্তান বিষয়টিকে আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করলেও নিরাপত্তা পরিষদে বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়নি।

এখন বাংলাদেশের বক্তব্যেও আন্তর্জাতিক মঞ্চে যাওয়ার হুঁশিয়ারি শোনা যাচ্ছে। ফলে ভারতকে ঘিরে জলকূটনীতির ক্ষেত্রে দুই প্রতিবেশী দেশের কৌশলের মধ্যে মিল খুঁজে পাচ্ছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ।

তবে এখনও ভারতবিরোধী কোনও আনুষ্ঠানিক যৌথ কূটনৈতিক জোটের প্রমাণ সামনে আসেনি। কিন্তু বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়ার পাশাপাশি জলসম্পর্কিত ইস্যুতে আন্তর্জাতিক মঞ্চের কথা বারবার উঠে আসায় বিষয়টি ভারতের জন্য কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

অর্থাৎ, তিস্তা থেকে গঙ্গা আর সিন্ধু—দক্ষিণ এশিয়ায় নদীর জল এখন শুধু সম্পদ নয়, ক্রমশ কূটনৈতিক চাপ তৈরির হাতিয়ারও হয়ে উঠছে।

No comments:

Post a Comment

Post Top Ad